মনুস্মৃতিতে স্ত্রী-বিমর্শ |
মনুস্মৃতিতে বর্ণিত স্ত্রীর (নারীর) মহত্ত্ব
◑মনুস্মৃতির অধ্যয়ন না করেই বর্তমানের তথাকথিত প্রগতিশীল বৌদ্ধিক বর্গ ও ম্লেচ্ছরা প্রত্যেক সমস্যার কারণ হিসেবে মনুস্মৃতির নাম উল্লেখ করার চেষ্টা করে।
◑পূর্বাগ্রহ মুক্ত হয়ে যদি প্রক্ষেপণরহিত মূল মনুস্মৃতির অধ্যয়ন করা হয় তাহলে জ্ঞাত হয় যে এটি অত্যন্ত উৎকৃষ্ট কৃতি। বেদের পর মনুস্মৃতিই স্ত্রীদের (নারীদের) সর্বোচ্চ সম্মান এবং অধিকার দেয়। বর্তমানের স্ত্রীবাদীরাও এই উচ্চতায় পৌঁছাতে অক্ষম হয়েছে।
◑মহর্ষি মনু বলেছেন যে–
যে কুলে নারীদের পূজা অর্থাৎ সম্মান হয়, সেই কুলে দিব্য গুণ, দিব্য ভোগ ও উত্তম সন্তান হয় এবং যে কুলে নারীদের পূজা হয় না, সেখানে তাহাদের সব ক্রিয়া নিষ্ফল হয় জানিবে।
এরূপ সর্বোৎকৃষ্ট সম্মান অন্যত্র পাওয়া দুর্লভ। আপনারা স্বয়ম্ অন্য মতবাদীদের মান্য গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করে দেখুন তাতে নারীদের এরূপ পূজন করার কথা তো পাবেনই না বরং তার উল্টো পাবেন। মহর্ষি মনু নারীদের বিষয়ে অনেক কিছুই বলেছেন যেমন –
পরিবারে স্ত্রীর মহত্ত্ব
পিতৃভির্ভ্রাতৃভিশ্চৈতাঃ পতিভির্দেবরৈস্তথা।
পিতা, ভ্রাতা পতি ও দেবরের পক্ষে যথাক্রমে স্বীয় কন্যা, ভগ্নী, স্ত্রী ও ভ্রাতৃবধূ আদি স্ত্রীকে সর্বদা পূজা করা উচিত অর্থাৎ যথাযোগ্য মধুর ভাষণ, ভোজন, বস্ত্র ও অলঙ্কারাদিদ্বারা প্রসন্ন রাখিবে। যাহারা কল্যাণ কামনা করে, তাহারা স্ত্রীদিগকে কখনও ক্লেশ দিবে না।
যে কুলে নারীরা স্ব স্ব পতির বেশ্যাগমনে বা ব্যভিচারাদি দোষে শোকাতুর থাকে, সেই কুল শীঘ্র বিনাশ প্রাপ্ত হয় এবং যে কুলে নারীরা পতির সদ্ব্যবহারে প্রসন্না থাকে, সেই কুল সর্বদা উন্নতি লাভ করে।
তানি কৃত্যাহতানীব বিনশ্যন্তি সমন্ততঃ ॥ ৩/৫৮
যে কুলে ও গৃহে নারীরা অপূজিত হইয়া অর্থাৎ সম্মানিত না হইয়া যে গৃহস্থকে শাপ প্রদান করে, সেই কুল ও গৃহস্থ, বিষপ্রয়োগে অনেকে যেরূপ এক সঙ্গে বিনষ্ট হয়, সেইরূপ চারিদিক হইতে নষ্ট হইয়া যায়।
যদি পুরুষ স্ত্রীকে প্রসন্ন না করে, তবে সেই স্ত্রীর অপ্রশ্নতা হেতু সমস্ত কুল অপ্রসন্ন ও শোকাতুর থাকে। যখন পুরুষদ্বারা স্ত্রী প্রসন্না থাকে, তখন সর্ব কুল আনন্দরূপে দৃষ্ট হয়।
স্ত্রিয়ঃ শ্রিয়শ্চ গেহেষু ন বিশেষোঽস্তি কশ্চন॥ ৯/২৬
হে পুরুষগণ ! স্ত্রীগণ গৃহে সন্তানোৎপত্তির জন্য মহাভাগ্য দায়িনী পূজার যোগ্যা, গৃহাশ্রমের দীপ্তিকারিণী ও সন্তানের জননী। তাহারা শ্রী অর্থাৎ লক্ষ্মীস্বরূপা, কারণ লক্ষ্মী, শোভা, ধন ও স্ত্রীতে কোন পার্থক্য নাই।
গর্ভধারণ করে সন্তান উৎপত্তির জন্য স্ত্রী এবং গর্ভাধানের জন্য পুরুষের রচনা করেছেন। এজন্য বেদে স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের সমানধর্ম বলা হয়েছে। অর্থাৎ স্ত্রী-পুরুষ উভয়ের পদ বরাবর, 'অসমানতা' হওয়া উচিৎ নয়।
দুহিত্রা দাসবর্গেণ বিবাদং ন সমাচরেৎ ॥ ৪/১৮০
মাতা, পিতা, ভগ্নী, ভ্রাতা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং সেবকদের সহিত কলহ বিবাদ অর্থাৎ বিরুদ্ধাচারণ করিবে না।
বিবাহের অধিকার
বরং কন্যা মৃত্যু পর্যন্ত বিবাহ না করিয়াই পিতৃগৃহে থাকিবে, তথাপি গুণহীন, অযোগ্য ও দুষ্ট পুরুষের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিবে না।
ঊদ্ধন্ত কালাদেতস্মাদ্বিন্দেত সদৃশং পতিম্॥ ৯/৯০
যখন কন্যা বিবাহ করার ইচ্ছা করিবে, তখন রজস্বলা দিন হইতেও ৩ (তিন) বর্ষ কাল অপেক্ষা করিয়া চতুর্থ বর্ষে নিজ যোগ্য পতিকে প্রাপ্ত করিবে।
পিতা আদি অভিভাবক দ্বারা বিবাহ না করে কন্যা যদি স্বয়ং পতিকে বরণ করে নেয়। তাহলে সেই কন্যা কোন পাপের ভাগী হয় না, আর না তাহার কোন পাপ দোষ হয় যে পতিকে সে বরণ করে।
যৌতুক-নিষেধ
নারী যানানি বস্ত্রং বা তে পাপা যান্ত্যধোগতিম্॥ ৩/৫২
পতির যে বান্ধবেরা [পিতা-মাতা, ভগ্নি-ভ্রাতা আদি সম্বন্ধী] মোহবশত স্ত্রীধন, স্ত্রীদিগের অশ্বাদি যান বা বস্ত্র আদি গ্রহণ করে, তাহা উপভোগ করে জীবন নির্বাহ করে সেই পাপীরা নীচগতি প্রাপ্ত হয় অর্থাৎ তাদের পতন হয়।
অনুশীলন– ৩/৫২ শ্লোকে চর্চিত স্ত্রীধনের বিবরণ মহর্ষি মনু ৯/১৯৪-১৯৭ শ্লোকে দিয়েছেন। প্রমুখতঃ এই ধন ছয় প্রকার হয় – ১.অধ্যগ্নি = বিবাহ সংস্কার উপলক্ষে প্রাপ্ত ধন, ২.অধি-আবাহনিকম্ = পতিগৃহে আসার সময় পিতৃগৃহ হইতে কন্যার প্রাপ্ত ধন, ৩.প্রীতিকর্মে প্রাপ্ত ধন = প্রসন্না আদি উপলক্ষে পতির প্রদত্ত ধন, ৪.ভ্রাতা হইতে প্রাপ্ত ধন ৫.পিতা হইতে প্রাপ্ত ধন, ৬.মাতা হইতে প্রাপ্ত ধন। বিস্তৃত জানতে ডা. সুরেন্দ্রকুমারজীর ভাষ্য মনুস্মৃতির নবম অধ্যায় দ্রষ্টব্য।
কন্যার পিতা আদি সম্বন্ধী যে কন্যার বিবাহের জন্য বর পক্ষ হইতে শুল্ক নেয়না অর্থাৎ বরপক্ষ হইতে বিবাহের কারণে কোন প্রকার ধন নেওয়া ছাড়াই বিবাহ দেয়, এই প্রকার বিবাহ কন্যা বিক্রয় বলা হয়না। এরূপ বিবাহ বাস্তবে কন্যাদের পূজা-সৎকার অর্থাৎ সম্মান করা। অর্থাৎ বিবাহের বদলে কোন প্রকার ধন নেওয়া উচিৎ নয়।
অল্পোহ্যপ্যেবং মহান্ বাপি বিক্রয়স্তাদেব সঃ॥ ৩/৫৩
কিছুই দেওয়া-নেওয়া না করে দুজনের প্রসন্নতা দ্বারা পাণিগ্রহণ হওয়া আর্ষ বিবাহ।
স্ত্রীদের স্বাধিকার
শৌচে ধর্মেঽন্নপক্ত্যাং চ পারিণাহ্যস্য বেক্ষণে ॥ ৯/১১
একত্রিত ধন রাখা, ব্যয় করা, শুদ্ধি, ধর্মসম্বন্ধী [৬/৯৩] অনুষ্ঠান, ভোজন তৈয়ারের ব্যবস্থা এবং গৃহের সকল বস্তুর দেখভালের কার্য্য স্ত্রীর অধিকারে রাখবে অর্থাৎ স্ত্রীর মার্গদর্শনে এইসব কার্য্য হওয়া উচিৎ।
এই শ্লোকদ্বারা এই ভ্রান্তধারণা নির্মূল হয়ে যায় যে স্ত্রীদের [নারীদের] বৈদিক কর্মকাণ্ডে অধিকার নাই। এই শ্লোকে এই ধারণার বিপরীতে স্ত্রীদের অগ্রণী রাখা হয়েছে।
সম্পত্তিতে অধিকার
তস্যাং আত্মনি তিষ্ঠন্ত্যাং কথং অন্যো ধনং হরেৎ॥ ৯/১৩০
যেমন নিজ আত্মা, তেমনই পুত্র অর্থাৎ নিজ আত্মা আর পুত্রে যেমন ভেদ নেই তেমন পুত্র কন্যায় ভেদ নেই, যদি পুত্র না থাকে তাহলে নিজ আত্মাস্বরূপ কন্যাই পিতা-মাতার ধনের অধিকারী হয়।
মাতার যে ধন, তাহা কন্যারই ভাগ হয় পরন্তু যাহার পুত্র নাই তাহার সম্পূর্ণ ধন দৌহিত্র প্রাপ্ত হবে।
পতিব্রতাসু চ স্ত্রীষু বিধবাস্বাতুরাসু চ ॥ ৮/২৮
বন্ধ্যা ও পুত্রহীন, কুলহীন অর্থাৎ যারা কুলে কোন পুরুষ জীবিত নেই, পতিব্রতা স্ত্রী অর্থাৎ যাহার পতি পরদেশগমন আদি কারনে যে স্ত্রী একা হয়ে যায়, বিধবা এবং রোগিণী স্ত্রীদের সম্পত্তি রাজা রক্ষা করবে যতক্ষণ না তারা সমর্থ হইবে।
জীবন্তীনাং তু তাসাং যে তদ্ধরেয়ুঃ স্ববান্ধবাঃ ।
তাঞ্ শিষ্যাচ্চৌরদণ্ডেন ধার্মিকঃ পৃথিবীপতিঃ ॥ ৮/২৯
যদি উপরোক্ত স্ত্রীরা জীবিত থাকা অবস্থায় তাদের ধন তাদের ভাই-বন্ধু আত্মীয় জন অপহরণ করে নেয়, বেদখল করে নেয় তাহলে ধার্মিক রাজা তাদের চৌর্যবৃত্তির দণ্ড দিবে।
স্ত্রীদের প্রাথমিকতা
চক্রিণো দশমীস্থস্য রোগিণো ভারিণঃ স্ত্রিয়াঃ ।
স্নাতকস্য চ রাজ্ঞশ্চ পন্থা দেয়ো বরস্য চ ॥ ২/১৩৮
রথারূঢ়, নব্বই ঊর্ধ্ব বয়সী, রোগী, ভারবাহী, স্ত্রী, স্নাতক, রাজা এবং বর এদের প্রথমে রাস্তা দিয়ে দেওয়া উচিৎ।
সুবাসিনীঃ কুমারীশ্চ রোগিণো গর্ভিণীঃ স্ত্রিয়ঃ ।
অতিথিভ্যোঽগ্র এবৈতান্ভোজয়েদবিচারয়ন্ ॥ ৩/১১৪
নববিবাহিতা, অল্পায়ু কন্যা, রোগী, গর্ভবতী স্ত্রী এদের অতিথিকে ভোজন করানোর পূর্বেই নিঃসন্দেহে ভোজন করিয়ে দিবে। অর্থাৎ বড়-ছোট ও অতিথিকে আগে পরে ভোজন করার বিচার বাদ দিয়ে প্রথমে তাদের ভোজন করাইবে।
স্ত্রীদের পীড়িত করলে কঠোর দণ্ডের বিধান
পুরুষাণাং কুলীনানাং নারীণাং চ বিশেষতঃ ।
মুখ্যানাং চৈব রত্নানাং হরণে বধং অর্হতি ॥ ৮/৩২৩
কুলীন পুরুষ এবং বিশেষরূপে স্ত্রীদের অপহরণ করলে তথা মুখ্য হীরা আদি রত্ন চুরি করলে শারীরিক দণ্ড (তাড়না দিয়ে প্রাণবধ পর্যন্ত) দেওয়া উচিৎ।
কূটশাসনকর্তৄংশ্চ প্রকৃতীনাং চ দূষকান্ ।
স্ত্রীবালব্রাহ্মণঘ্নাংশ্চ হন্যাদ্দ্বিট্সেবিনস্তথা ॥ ৯/২৩২
রাজাজ্ঞা উল্লঙ্ঘনকারী, প্রকৃতি-প্রজা, মন্ত্রী সেনাপতি আদি রাজকর্মচারীদের মধ্যে ভেদকারী, স্ত্রী, শিশু ও বিদ্বানদের হত্যাকারী তথা শত্রুপক্ষে মিলিত হয়ে তাদের সেবাকারী, এই দুষ্টদেরকে রাজা প্রাণবধ দ্বারা দণ্ডিত করবে।
অমৃতস্য পুত্রাঃ
©️আর্য প্রতিনিধি সভা বাংলাদেশ