▪️বেদ চারটি হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন শাস্ত্রে বেদত্রয়ী বলা হয়েছে কেন?
বিষয়ভেদে বেদ চারটি, যথা- ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এবং অথর্ববেদ। বিষয়ভেদে চারটি হলেও শৈলীভেদে বেদ তিনটি, যথা- ঋক, যজু এবং সাম। এই তিন প্রকার বা তিনরকম শৈলীর মন্ত্র রয়েছে চার বেদে। মীমাংসা দর্শনেও বলা হয়েছে -
পদার্থঃ- (যত্র) যে মন্ত্রে (অর্থবশেন) ছন্দ শাস্ত্রানুসারে (পাদব্যবস্থা) পাদ ব্যবস্থা [ছন্দোবদ্ধ] রয়েছে (তেষাং) সেই মন্ত্র (ঋগ্) ঋগ্বেদ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত।
তেষাং ঋগ যত্রার্থবশেন পাদ ব্যবস্থা।। (পূর্বমীমাংসা- ২/১/৩৫)
অনুবাদঃ- যে মন্ত্রে ছন্দ শাস্ত্রানুসারে পাদ ব্যবস্থা [ছন্দোবদ্ধ] রয়েছে সেই মন্ত্র ঋগ্বেদ সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত।
[এখানে এটা স্মরণ রাখা উচিত যে 'ছন্দ শাস্ত্রানুসারে' এই কথনের তাৎপর্য এই নয় যে ছন্দ শাস্ত্র লেখার পরবর্তীতে বেদ উৎপত্তি বা প্রকাশিত হয়েছে। ঋগ্ আদি মন্ত্রের বিভাগের উপায় বা চিহ্নিত করার উপায় ছন্দ শাস্ত্রে বর্ণন করা হয়েছে তাহা জানা উচিৎ]
গীতিষু সামাখ্যা ।। (মীমাংসা ২/১/৩৬)
পদার্থঃ- (গীতিষু) গায়নশৈলী [গীতিবিশিষ্ট] মন্ত্রের নাম (সামাখ্যা) সাম। অনুবাদঃ- গায়নশৈলী বা গীতিবিশিষ্ট মন্ত্রের নাম সাম।
শেষে যজুঃশব্দঃ।। (মীমাংসা ২/১/৩৭)
পদার্থঃ- (শেষে) যে মন্ত্র ছন্দোবদ্ধ নয় এবং গায়নশৈলীও নয় সেই মন্ত্রের নাম (যজুঃশব্দঃ) যজুর্বেদ।অনুবাদঃ- যে মন্ত্র ছন্দোবদ্ধ নয় এবং গায়নশৈলীও নয় সেই মন্ত্রের নাম যজুর্বেদ।
এইপ্রকারে মীমাংসক ঋষি জৈমিনি বুঝিয়েছেন যে তিন প্রকার মন্ত্র চার বেদে রয়েছে। তাছাড়াও সর্বানুক্রমনীবৃত্তির ভূমিকায় "পঙ্গুরুশিষ্য" বলেছেন -
অনুবাদঃ- যজ্ঞে তিন প্রকার রূপের মন্ত্র বিনিযুক্ত হয়। চার বেদে তাহা - ঋগ, যজু এবং সাম রূপে রয়েছে।"বিনিয়োক্তঞ্চরূপশ্চ ত্রিবিধঃ সম্প্রদর্শ্যতে।ঋগ যজুঃ সামরূপেন মন্ত্রোবেদচুতষ্টয়ে।।"
ঋগ্ - যজু - সাম শৈলী বা গদ্যাত্মক - পদ্যাত্মক - গানাত্মক মন্ত্রের জন্য অথবা বেদে জ্ঞান - কর্ম - উপাসনা এই তিন প্রকার কর্তব্য বর্ননা করার জন্য বেদকে ত্রয়ীবিদ্যা বা 'বেদত্রয়ী' বলা হয়। বেদের ব্যাখ্যান ব্রাহ্মণ গ্রন্থেও বলা হয়েছে -
ত্রয়ী বৈ বিদ্যা ঋচো যজুংষি সামানি ইতি।। (শতপথব্রাহ্মণ - ৪/৬/৭/১)
অর্থাৎ - ঋগ্, যজু, সাম [এই তিন প্রকার] বিদ্যার কারনে ত্রয়ী নাম। তাছাড়াও, মুণ্ডকোপনিষদ-১/১/৫, ছান্দোগ্য উপনিষদ-৭/১/২, ছান্দোগ্য উপনিষদ-৭/২/১, ছান্দোগ্য উপনিষদ-৭/৭/১ সহ বিভিন্ন শাস্ত্রে অসংখ্য শ্লোকাদিতে চার বেদের উল্লেখ করা হয়েছে। মুণ্ডকোপনিষদে বিষয়ভেদে চার করেছেন এবং ২/১/৬ শ্লোকে মন্ত্রভেদে তিন প্রকারের উল্লেখ করেছেন। গোপথব্রাহ্মণ পূর্বভাগ ১/২৯ কণ্ডিকায় ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্বেদ এই চার বেদেরই উল্লেখ রয়েছে কিন্তু তদন্তরই চারবেদে "ত্রয়ো বেদা" বলেছেন। একইভাবে চার বেদের উল্লেখপূর্বক চারবেদকে "ত্রিভির্বেদৈ" বলেছেন।
অথর্ববেদকে নবীন মান্যকারীরা ঋগ্বেদ কে সর্বপ্রাচীন মান্য করে, অনেকে আবার ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ এই তিন বেদকেই প্রাচীন বলিয়া থাকেন। কিন্তু সেই প্রাচীন ঋগ্বেদ - ১০/৯০/৯ মন্ত্রে 'অথর্ববেদ' এর নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। তাছাড়াও এই একই মন্ত্র ও অথর্ববেদের নাম যজুর্বেদেও উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই মন্ত্রটি হল -
তস্মাদ্যজ্ঞাৎসর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে।ছান্দংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্যজুস্তস্মাদজায়ত।।
(যজুর্বেদ-৩১/৭)
পদার্থঃ- (তস্মাৎ) সেই (যজ্ঞাৎ) সর্বদাতা (সর্বহুতঃ) পূজনীয় সর্বোপাস্য পরমেশ্বর হইতে (ঋচঃ) ঋগ্বেদ (সামানি) সামবেদ (জজ্ঞিরে) উৎপ্নন হয়েছে (তস্মাৎ) সেই পরমাত্মা থেকেই (ছান্দংসি) অর্থববেদ (জজ্ঞিরে) উৎপন্ন হয়েছে (তস্মাৎ) সেই জগদীশ্বর থেকে (য়জুঃ) যজুর্বেদ (অজায়ত) প্রকট হয়েছে।
ভাবার্থঃ- এই মন্ত্রটি পুরুষ সুক্তের। এই অধ্যায়ে যজ্ঞ শব্দ পুরুষের পর্যায়বাচী। পুরুষের অর্থ পূর্ণ পরমেশ্বর। যজ্ঞের অর্থ হয়েছে পূজনীয় পরমেশ্বর।
যখন সৃষ্টি-রূপী যজ্ঞ প্রারম্ভ হয়েছে তখন পরমেশ্বর, মনুষ্য মাত্রের জন্য চার বেদের জ্ঞান প্রদান করেছেন। সেই যজ্ঞপুরুষ হইতে - ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ, অথর্ববেদ এই চার বেদ প্রকট হয়েছে।
পাশ্চাত্ত্য বিদ্বান্ বলে থাকে যে, অথর্ববেদ মনুষ্যের তৈরি কিন্তু উক্ত মন্ত্র দ্বারা এই নিরাধার কল্পনার খণ্ডণ হয়ে যায়। প্রভুজী সর্গারম্ভেই চার ঋষিকে চার বেদের জ্ঞান প্রদান করেছেন।
বেদে অন্যত্রও অনেক স্থানে চার বেদের বর্ণনা পাওয়া যায়। অতঃ 'ছন্দাংসি' শব্দের অর্থ অথর্ববেদ ই হবে। এখানে 'ছন্দাংসি' বিশেষণ নয়।
সুতরাং অথর্ববেদকে নবীন বলা ভুল বলিয়া বিবেচ্য। কারন সৃষ্টির প্রারম্ভেই চার বেদ পরমাত্মা হইতে উৎপ্নন (প্রকাশিত) হয়।
🖋️প্রিয়রত্ন বিদ্যার্থী
©️অমৃতস্য পুত্রাঃ
সত্যের প্রচারক।
Tags:
বেদ