ছান্দোগ্য উপনিষদে কি আদি শঙ্করাচার্যের দ্বারা অশ্লীল ভাষ্য হয়েছে?

 


প্রশ্ন: ছান্দোগ্য উপনিষদে কি আদি শঙ্করাচার্যের দ্বারা অশ্লীল ভাষ্য হয়েছে?

ছান্দোগ্য উপনিষদ (১/৬/৭)-এ একটি উপমা রয়েছে:  

"কপ্যাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী"

– যার অর্থ আদি শঙ্করাচার্য করেছেন:  

"বানরের পায়ুপথের মতো লাল পদ্মের মতো চোখ"

এ ব্যাখ্যাটি শুনতে কিছুটা অস্বস্তিকর বা অশ্লীল মনে হতে পারে।

রামানুজ আচার্য এই শ্লোকের ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে করেছেন এবং তা অনেক মার্জিতভাবে উপস্থাপন করেছেন:

"কং পিবতীতি কপিঃ আদিত্যঃ। 

কে জলেঽপ্যাস্ত ইতি কপ্পাসং – সলিলস্থমি ত্যর্থঃ"

অর্থাৎ – ‘যিনি জল শোষণ করেন, তাকেই "কপি" বলা হয় – এখানে "কপি" মানে বানর নয়, বরং সূর্য

তারপর ভগবান রামানুজাচার্য শঙ্করের ভাষ্যকে অশ্লীল বলে সরাসরি সমালোচনা করেন এবং বলেন:

"মর্কট-জঘন-সদৃশ-পুন্ডরীক-সাদৃশ্যাদি অর্থান্তরং তু অশ্লীলত্বাদি দোষদুষ্টতয়া বাক্যক্কদনাদৃতত্বাদ্ ভাষ্যকারেণাপ্যনাদৃতম্"

অর্থাৎ – রামানুজাচার্যও আদি শংকরের ভাষ্যকে অশ্লীল ভাষ্যই মেনেছেন এবং বৈদিক ব্যাকরণের মাধ্যমে তার খণ্ডনও করেছেন।।

*●▬▬▬▬🌼🌸🌼▬▬▬▬●*

এই অনুবাদে মূল বিষয়টি বজায় রাখা হয়েছে—আদি শঙ্করাচার্যের এক ব্যাখ্যাকে রামানুজাচার্য অশ্লীল মনে করেছিলেন এবং তার ব্যাকরণিক ও শাস্ত্রীয় ভিত্তিতে প্রতিরোধ করেছিলেন।

শৈবভাষ্যের আলোকে ছান্দোগ্য উপনিষদ বাক্য মীমাংসা:

ছান্দোগ্য উপনিষদে পরমেশ্বর নেত্রের উপমা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে। 

ছান্দোগ্য উপনিষদে (১/৬/৭) এ বলা হয়েছে 

                                        "কপ্যাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী"

এই উপনিষদবাক্যের ব্যাখ্যাতে শ্রীকণ্ঠারাধ্য ( নীলকণ্ঠ শিবাচার্য) ব্রহ্মসূত্র মীমাংসা ভাষ্যে ( ১/১/২১) - এ বলেছেন -

"কপ্যাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী" ইতি ত্রিলোচনস্য পরমেশ্বরস্য লোচনদ্বযগ্রহণং পুণ্ডরীকসাদৃশ্যবর্ণানার্থে,ন তৃতীযলোচনাভাবদ্যোতনপরম্।তথা হি- ত্রিপুত্রং ব্রাহ্মণং প্রতি "দ্বৌ পুত্রাবস্যাগ্নিকল্পা" বিৎযুক্তে দ্বিসংখ্যা গ্রহণং ন শেষপুত্রনিষেধপরং,কিন্তু পুত্রদ্বযস্যাগ্নিসাদৃশ্যপরম্,তদ্বদত্রাপি।

কমুদকং রশ্মিভিঃ পবতীতি কপিরাদিত্যঃ,তেনাসিতং বিকসিতং পুণ্ডরীকাক্ষং যথা স্ফুরতি তথা পরমেশ্বরস্য লোচনদ্বযম্। তৃতীয লোচনং তু মুকুলিতস্বভাং বিকসিতপুণ্ডরীকসদৃশং ন ভবতি,মুকুলিতপুণ্ডরীকসদৃশমিত্যক্ষিপ্রাযঃ।অসৌ যো'বসর্পতি নীলগ্রীবো বিলোহিতঃ উতৈনং গোপা' অদৃশ্যন্নদৃশ্রন্নুদহার্যঃ স দৃষ্টো মৃডযাতি নঃ।।(তৈ.সঃ৪/৫/১) ইতি নীলগ্রীবস্য পরমেশ্বরস্য সর্বক্ষুতপ্রত্যক্ষত্বাবগমাৎ।

অর্থঃ- "কপ্যাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী"শ্রুতিবাক্যে পদ্মের সদৃশ লোচন বর্ণনার্থে লোচনদ্বয় গ্রহণ করা হয়েছে । এটি দ্বারা তৃতীয় নয়নের অভাবকে ইঙ্গিত করে না তথা তৃতীয় নয়নের অনস্তিত্ব বোঝানো হয় নি । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, এক ব্রাহ্মণের তিন পুত্রের মধ্যে দুই পুত্র অগ্নির ন্যায় তেজস্বী সদৃশ।এই দুই শব্দ দ্বারা কখনো তৃতীয় পুত্রের অনুপস্থিতি অথবা অনস্তিত্ব বোঝানো হয় না।বরং দুইপুত্রের শুধু প্রসংশাটাকেই বোঝানো হয়।তদ্রূপ 

কম্ অর্থে জল এবং রশ্মি দ্বারা সেই জল গ্রহণের হেতু কপি হলেন সূর্য যা দ্বারা বিকশিত পদ্মের ন্যায় পরমেশ্বরের লোচনকে বোঝানো হয়েছে। এবং তৃতীয় নয়নটি এই সূর্য দ্বারা বিকশিত পদ্মের ন্যায় নয় বরং মুকুল সদৃশ হওয়ার হেতুই কেবল মাত্র লোচনদ্বয়কেই বিকশিত পদ্মসদৃশ বলা হয়েছে। যা দ্বারা কখনোই তৃতীয় নয়নকে অনস্বীকার্যতা প্রমাণিত হয় না।তৈত্তিরীয় সংহিতার বচন দ্বারা সকলেই সেই নীলগ্রীব পরমেশ্বরকে দর্শন করে এটা বুঝানো হয়েছে। 


⚛️ জগৎগুরু শ্রীপতি পণ্ডিতারাধ্য কৃত ব্যাখ্যা -

কং জলং রস্মিভিঃ পিবতীতি কপিঃ- সূর্য। তেন আসং আসিতং বিকসিতমিত্যর্থঃ।পুণ্ডরীকং যথা স্ফরতি তথা মহেশ্বরস্য লোচনদ্বয়ম্।তৃতীযলোচনন্তু মুকুলীকৃতস্বভাবং বিকসিতপুণ্ডরীকসদৃশং ন ভবতী,কিন্তু মুকুলীকৃতপুণ্ডরীকসদৃশ-

মিন্যভিপ্রাযেন "অক্ষিণী"ইতি দ্বিবচনস্য ন তৃতীযলোচনাভাবপরত্বম্।পুত্রত্রিতযবন্তং ব্রাহ্মণং প্রতি " দ্বৌ পুত্রাবস্যাগ্নিকল্পৌ"ইত্যুক্তে দ্বিপুত্রসংখ্যাগ্রহণং ন শেষপুত্রনিষেধপরম্,কিন্তু পুত্রদ্বযস্যাগ্নিসাদৃশ্যপরং,এবং লোকে বহুশ বেদিতব্যম্।

অর্থঃ 'কং' অর্থ জল এবং সূর্য রশ্মি দ্বারা এটি পান তথা গ্রহণের হেতু কপি শব্দটি হলেন সূর্য। সূর্যের দ্বারা যেভাবে পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়, ঠিক সেভাবেই মহাদেবের দুটি চোখও বিকশিত পদ্মের মতো উজ্জ্বল। তবে, তাঁর তৃতীয় চোখটি মুকুলিত পদ্মের মতো, প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো নয়। এই কারণে 'অক্ষিণী' (দুটি চোখ) এই দ্বিবচন প্রয়োগ করা হয়েছে, যার অর্থ এই নয় যে তাঁর তৃতীয় চোখটি নেই।

উদাহরণস্বরূপ, যখন তিন পুত্রবিশিষ্ট একজন ব্রাহ্মণ সম্পর্কে বলা হয় যে, "তাঁর দুটি পুত্র অগ্নিতুল্য", তখন এর মানে এই নয় যে তাঁর তৃতীয় পুত্রটি নেই। বরং এর দ্বারা কেবল সেই দুই পুত্রের অগ্নিসদৃশ গুণেরই প্রশংসা করা হয়। এই ধরনের দৃষ্টান্ত দৈনন্দিন জীবনেও বহুভাবে দেখা যায়। সুতরাং এই দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করে পরমেশ্বর শিবের ত্রিনয়ন সমস্যা সমাধান হয়।

✅ এছাড়াও কপি শব্দের যে যৌগিকার্থ করা হয়েছে সেটি সম্পূর্ণ ন্যায় সম্মত।কারণ এটি না করলে ব্রহ্মের চক্ষুদ্বয়ে হীন উপমা প্রয়োগ করা হতো।

এবিষয়ে আচার্য শ্রীপতি পণ্ডিতারাধ্য বৃদ্ধ শতাতপ স্মৃতি বচন উদ্ধৃতি করেছেন। তথায় বলা হয়েছে-

কং জলং কিরণৈস্সম্যক্পিবতীতি প্রভাকরঃ।

কপিশব্দেন নির্দিষ্টো বেদবেদান্তপারগৈঃ।

আসং বিকসিতং প্রোক্তং যোগিভিঃ পারমার্থিকৈঃ।।

তস্মাদুৎফুল্লবনজনযনদ্বযশোভিতম্।

চিদচিদ্বিশ্বরক্ষার্থ কৃপযা পদ্মকোশবৎ্।।

মুকুলীকৃতসদ্বহ্নিনেত্রং শূলধরং বিভুম্।

ধ্যাযেদ্যেগী মহাদেবং জগজ্জন্মাদিকরণম্।।

অর্থঃ বেদবেদান্তে পারদর্শী ব্যক্তিগণ প্রভাকর সূর্যকে কপি শব্দ দ্বারা নির্দেশ করেন কারণ সূর্য কং তথা জলকে নিজ কিরণ দ্বারা পান করেন।যোগিগণ আসং শব্দটিকে বিকশিত বলে পারমার্থিক দৃষ্টিকোণে ব্যাখ্যা করেন।চিৎ ও অচিৎ বিশ্বের রক্ষাকর্তা ও পদ্মকোষবৎ (পদ্মকোষের ন্যায় ধারণকারী) পরম কৃপাময় শিবের নয়নদ্বয় যেন সূর্য দ্বারা বিকশিত বনজ ফুল তথা পদ্মের ন্যায় শোভিত।আর মুকুলের ন্যায় বদ্ধ তৃতীয় অগ্নিনেত্র যাহার সেই জগজ্জন্মাদির কারণস্বরূপ শূলধর মহাদেবকেই যোগীগণ নিজ হৃদয়ে ধ্যান করেন।।

⚛️ শৈব পরম্পরার পূর্ববর্তী আচার্যগণও ছান্দোগ্য উপনিষদের এই বাক্যে ঈশ্বরের নেত্রদ্বয়ের উপমা চন্দ্র, সূর্যের সাথেই করেছেন অর্থাৎ কপি শব্দের আদিত্য অর্থ করেছেন।

নীলকন্ঠভগবৎপাদ-ভট্টভাস্কর-ঘণ্টানাথ-জ্যোতির্নাথাদিপূর্বাচার্যৈছান্দোগ্যভাষ্যে - 

"কপ্পাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী" ইতি বাক্যে তস্য পরমেশ্বরস্য লোকানুগ্রহার্থ সূর্যচন্দ্রাত্মকনেত্রদ্বয়ং বিকসিতং মুকুলীকৃতং তৃতীয়লোচনমিতি ব্যাখ্যাতম্।। 

অনুবাদঃ ভগবৎপাদ নীলকণ্ঠ, ভট্টভাস্কর, ঘণ্টানাথ, জ্যোতির্নাথ প্রভৃতি পূর্বাচার্যগণ ছান্দোগ্যভাষ্যে– "কপ্যাসং পুণ্ডরীকমেবমক্ষিণী" এই বাক্যে সেই পরমেশ্বরের লোকদের অনুগ্রহের জন্য সূর্য-চন্দ্রাত্মক নেত্রদ্বয়কে বিকশিত, মুকলিতকৃত তৃতীয় নেত্র এরূপ ব্যাখ্যা করেছেন।

⚛️ বিঃদ্রঃ এখানে শিব ও তৃতীয় নয়ন থাকার কারণ লেখাটা শৈবাচার্যদের ভাষ্য থেকে নেওয়া হয়েছে। তবে আর্য সমাজের অনুসারী হওয়ার কারণে আমরা তৃতীয় নয়ন ও শিব সম্পর্কিত কথাগুলো উপেক্ষা করব। এখানে দেখানোর বিষয়টি হলো শৈবাচার্যগণও ঈশ্বরের নেত্রের উেমা দিতে গিয়ে শঙ্করাচার্যের মতো অশ্লীল পথ অবলম্বন করেননি।

⚛️ অমরকোষেও কং শব্দের অর্থ 'জল' নেওয়া হয়েছে


রামানুজাচার্য কর্তৃক খণ্ডন

রামানুজাচার্য কর্তৃক খণ্ডন

শৈবাচার্য পণ্ডিতারাধ্যায়কৃত ব্যাখ্যা শ্রীকরভাষ্য থেকে

নীলকন্ঠ আচার্যকৃত ব্রহ্মসূত্রের শ্রীকণ্ঠভাষ্য হতে ব্যাখ্যা

অমরকোষ হতে 'কং' শব্দের অর্থ -

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন