রামায়ণকালীন সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা

রামায়ণকালীন  সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা


 শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতির যথাযথ বিস্তার ও উন্নতির জন্য, এবং ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় অগ্রগতির জন্য শিক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মানুষের জীবনে শিক্ষার সর্বাধিক গুরুত্ব রয়েছে। চরিত্র গঠন, ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশ, কর্তব্যবোধের জাগরণ, প্রাচীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ—এই সকল উদ্দেশ্য পূরণের জন্য শিক্ষার প্রয়োজন।

রামায়ণ-যুগের সংস্কৃতিতে শিক্ষার কত ব্যাপক প্রসার ছিল, তা রাজা দশরথের শাসিত অযোধ্যা নগরীর বর্ণনা থেকে বোঝা যায়। সেখানে এমন কোনো নাগরিক ছিল না, যে বহু শাস্ত্র অধ্যয়ন করেনি বা যে অশিক্ষিত ছিল—
“ন কশ্চিদ্‌ বহুশ্রুতঃ” … “নাবিদ্বান্‌ বিদ্যতে ক্বচিত্‌” (বালকাণ্ড ৬.১৪)
অর্থাৎ—কেউই এমন ছিল না, যে বিদ্যাহীন বা অজ্ঞ।

শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল মানুষকে সাক্ষর করা নয়, বরং তাকে সুশিক্ষিত ও সুশীল করে তোলা—
“শীলবৃত্তফলং শ্রুতম্‌”
অর্থাৎ, শিক্ষার ফল হলো চরিত্র ও আচরণের উন্নতি।

রামায়ণে শিক্ষাদানকারীদের জন্য বহু ভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা শিক্ষার বিস্তৃত প্রচারের প্রমাণ দেয়। যেমন— গুরু, আচার্য, কুলপতি, শ্রোত্রিয়, তাপস, ব্রহ্মবাদী, উপাধ্যায়, শিক্ষক, পরিব্রাজক প্রভৃতি।

তৎকালীন যুগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে আশ্রমগুলির সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ছিল। শত শত শিষ্য আশ্রমে থেকে শিক্ষা গ্রহণ করত। ভরদ্বাজ ঋষির আশ্রমে সর্বদা যজ্ঞ, অগ্নিহোত্র, বেদ অধ্যয়ন এবং পুরাণকথা পাঠ চলত (অযোধ্যাকাণ্ড ৫৪.১১-১২)। বাল্মীকি ঋষির আশ্রমেও একই অবস্থা ছিল। তবে সেখানে কলা ও সংগীতের শিক্ষাও দেওয়া হতো। লব ও কুশ বাল্মীকি ঋষির কাছে গান ও বীণা বাজানো শিখেছিল (উত্তরকাণ্ড ৬৩.১৪-১৬)।

অযোধ্যার আশেপাশে বেদের বিভিন্ন শাখা অধ্যয়নের জন্য অনেক ছাত্রসংঘ বা বিদ্যালয়ও ছিল। বনবাসে যাওয়ার সময় রাম তাদের সকলকে সম্মানের সঙ্গে প্রচুর ধন দান করেছিলেন (অযোধ্যাকাণ্ড ২৩.১৫-১৬)।

এছাড়াও সভা, বন-উপবন, বৈঠক এবং বৃহৎ যজ্ঞ ইত্যাদিতে পারস্পরিক আলোচনা, বিতর্ক ও তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষালাভ হতো। রাজা দশরথের অশ্বমেধ যজ্ঞে সমবেত বিদ্বানরা বিভিন্ন কাজের বিরতিতে নানা ধরনের শাস্ত্র আলোচনা করতেন—

কর্মান্তরে তদা বিপ্রা হেতুবাদান্ বহূনপি। প্রাহুঃ সুবাগ্মিনো ধীরাঃ পরস্পরজিগীষয়া।।(বালকাণ্ড ১৪.১৯)
অর্থাৎ, তারা পরস্পরকে পরাজিত করার উদ্দেশ্যে যুক্তি-তর্কে লিপ্ত হতেন।

দশরথের মৃত্যুর পর রাজ্য পরিচালনাকারী ব্রাহ্মণরা দ্রুত নতুন রাজা নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। কারণ, যেখানে রাজা থাকে না, সেখানে পণ্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞ লোকেরা বন-উপবনে থেকে আলোচনা করতে আগ্রহী হন না—
নারাজকে জনপদে নরাঃ শাস্ত্রবিশারদাঃ। সংবদন্তোপিষ্ঠন্তে বনেষুপবনেষু চ।। (অযোধ্যাকাণ্ড ৬৭.২৬)

রামায়ণে বর্ণিত ভারতীয় সামাজিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক জীবন

চিত্তকূটের সভায় জাবালি ঋষি ও রামের মধ্যে যে সংলাপ হয়েছিল (অযোধ্যাকণ্ড ১০৮.১০৬), তা নাস্তিক ও আস্তিক মতের গুণ ও দোষ বোঝানোর জন্য যথেষ্ট শিক্ষণীয়।

সেই সময় বেদ অধ্যয়নের একটি সুনিশ্চিত পরম্পরা ছিল। শিক্ষার ধরন মূলত মৌখিক ছিল। তবে মানুষ লেখণ কার্যের সঙ্গেও পরিচিত ছিল। অশোকবাটিকায় সীতার কাছে হনুমান যে আংটি নিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে রামের নাম লেখা ছিল—
"রামনামাঙ্কিতং চেদং পশ্য দেব্যঙ্গুলীয়কম্" (সুন্দরকাণ্ড ৩৬.২)
অর্থাৎ—“হে দেবী, এই আংটিটি দেখুন, এতে রামের নাম খোদাই করা আছে।”

লঙ্কার যুদ্ধে রামের বাণগুলিতেও তাঁর নাম লেখা থাকত—
 "রামনামাঙ্কিতৈঃ শরৈঃ" (যুদ্ধকাণ্ড ৬৪.২৫)

লেখণকার্যের স্পষ্ট প্রমাণ থাকলেও, এটি পরিষ্কার যে রামায়ণের যুগে শিক্ষা প্রধানত মৌখিকভাবেই দেওয়া হতো। শ্রুতি (শোনা ও মুখে মুখে প্রচারিত জ্ঞান) পরম্পরা অবিচ্ছিন্ন ছিল।

তৎকালীন সংস্কৃতিতে শিক্ষার বিষয়গুলো বিভিন্ন স্থানে বিভিন্নভাবে উল্লেখিত হয়েছে। দ্বিজাতিদের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য) জন্য বেদ অধ্যয়ন বাধ্যতামূলক ছিল এবং বেদের জন্য “ত্রয়ী” শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। ঋক, যজুঃ ও সাম বেদের সঙ্গে সঙ্গে অথর্ব বেদও অধ্যয়ন করা হতো।(১)
রাম বেদে পারদর্শী ছিলেন (সুন্দরকাণ্ড ৩৫.১৪), এবং সেই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন বেদাঙ্গও সুসংগঠিতভাবে প্রচলিত হয়েছিল।

উপনিষদের জ্ঞানের জন্য “বেদান্ত” শব্দটি ব্যবহৃত হতো এবং বেদান্তের শিক্ষাও দেওয়া হতো। রাবণের জন্য “বেদান্তগঃ” (যুদ্ধকাণ্ড ১০৯.২৩) বিশেষণ ব্যবহৃত হয়েছে, অর্থাৎ তিনি বেদান্তে পারদর্শী ছিলেন।
এইভাবে, রামায়ণের যুগে সমগ্র বৈদিক সাহিত্য—চার বেদ, বেদাঙ্গ ও বেদান্ত—শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল।(২)

আর্য ও রাক্ষসদের সংঘর্ষপূর্ণ সেই যুগে প্রত্যেক মানুষের শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন ছিল। তাই যুদ্ধবিদ্যা সেই সময়ের শিক্ষার একটি অপরিহার্য অংশ ছিল। যুদ্ধশিক্ষার মাধ্যমে ব্যায়াম হতো এবং দক্ষতাও অর্জিত হতো।
রামায়ণের প্রায় সকল প্রধান পুরুষ চরিত্রই ধনুর্বিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন—
"ধনুর্বেদে চ নিষ্ঠিতাঃ"

রাষ্ট্রের সুষ্ঠ পরিচালনার জন্য রাজনীতি ও কূটনীতির শিক্ষার (অযোধ্যাকাণ্ড ১০০.১৬, ২১, ৩৬) প্রয়োজনীয়তা ছিল। রাম (সুন্দরকাণ্ড ৩৫.১৪) ও সীতা রাজনীতি ও রাজধর্ম সম্পর্কে খুবই জ্ঞানী ছিলেন—
 "অভিজ্ঞা রাজধর্মাণাং" (অযোধ্যাকাণ্ড ২৬.৪)

পুরাণ, ইতিহাস ও ধর্মশাস্ত্রও সেই সময়ের শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত ছিল, কারণ এগুলি ভালোভাবে না জানলে ন্যায়বিচার ও শাস্তির সঠিক প্রয়োগ সম্ভব নয় (অযোধ্যাকাণ্ড ১০০.৩৬, ৩৮)।

পরিবার বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে অর্থশাস্ত্র (অযোধ্যাকাণ্ড ১০০.৫৪-৫৫) একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাবিষয় ছিল।
রামায়ণের সব কাণ্ডেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে রামায়ণের এমন একটি স্থানও রয়েছে, যেখানে তৎকালীন শিক্ষার বিভিন্ন বিষয় একত্রে উল্লেখিত হয়েছে।

১. যুদ্ধকাণ্ড১০৫.১৩, বালকাণ্ড ১৫.২, বালকাণ্ড ১৪.৪৩-৪৪ হোতা, অধ্বর্যু, উদগাতা এবং ব্রহ্মা নামের দ্বারা চারবেদকেই গ্রহণ করা হয়েছে। 

২. (অযোধ্যাকাণ্ড ১.২০) (কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড ৩.২৮-২৯) (বালকাণ্ড ১৪.৩) (যুদ্ধকাণ্ড ২৮.১৯) (বালকাণ্ড ১৪.৩৫) প্রভৃতি লব-কুশের গান শোনার জন্য রাম রাজসভায় যেসব বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন (উত্তরকাণ্ড ৯৪.৪–১০), তাদের মাধ্যমে তৎকালীন শিক্ষাবিষয়গুলির একটি দীর্ঘ তালিকা পাওয়া যায়। সেই অনুযায়ী, সেই সময়ের সংস্কৃতিতে শিক্ষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল—বেদ, পুরাণ, ব্যাকরণ, সংগীত, ছন্দশাস্ত্র, জ্যোতিষ, ক্রিয়াকল্প, বিভিন্ন ভাষা, চিত্রকলা, নীতিশাস্ত্র, যুদ্ধবিদ্যা, বেদান্ত, শাসনব্যবস্থা, ধর্মশাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র ইত্যাদি।

এগুলির পাশাপাশি, সময় সময় গুরু, পিতা (অযোধ্যাকাণ্ড ৩.৪০–৪৬) এবং বড় ভাই (অযোধ্যাকাণ্ড/১০০) নৈতিক শিক্ষা প্রদান করতেন।

তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় গুরু বা শিক্ষকের স্থান ছিল সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই গুরুকে সম্মান করা ছিল প্রধান কর্তব্য। মা-বাবা যেমন জন্ম দেন, তেমনি শিক্ষা দেওয়ার কারণে গুরু-ও পিতার সমান (কিষ্কিন্ধ্যাকাণ্ড ১৮.১৩)।
গুরুর আদেশ কখনোই অমান্য করা উচিত নয় (বালকাণ্ড ২৬.৩; অযোধ্যাকাণ্ড ৩০.৩৩)। গুরুর কথা পালন করলে সৎ মানুষের পথ অনুসরণ করা যায়—

“মম ত্বং বচনং কুর্বন্ নাতিবর্তেঃ সতাং গতিম্” (অযোধ্যাকাণ্ড ১১১.৪)
অর্থাৎ—“আমার কথা পালন করলে তুমি সৎ মানুষের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না।”

শিষ্য যদি অনুগত ও যোগ্য হয়, তবে গুরু আনন্দের সঙ্গে তার সমস্ত জ্ঞান প্রদান করেন (বালকাণ্ড ২৭,, বালকাণ্ড ২৮)।

এ থেকে স্পষ্ট যে, রামায়ণ যুগের শিক্ষা ব্যবস্থায় ভারতীয় সংস্কৃতির নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের লালন করা হতো এবং ব্যক্তির সর্বাঙ্গীণ বিকাশের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হতো।

🖋️লেখক - পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায়
সংস্কৃত বাঙময়ের বৃহৎ ইতিহাস, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১১৭-১২০

©️অমৃতস্য পুত্রাঃ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please Select Embedded Mode To Show The Comment System.*

নবীনতর পূর্বতন