প্রায়শ অনেকের মনে প্রশ্ন জাগরিত হয়, এই যে বিবিধ ধর্ম প্রচলিত রয়েছে যা একে অপরের বিপরীত, সামান্য মিলও দৃষ্ট হয় এবং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মকে সত্য ও সঠিক বলে দাবী করে , কিন্তু আসলেই কে সঠিক আর ধর্ম'ই বা কি?
বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী মনে এরূপ প্রশ্ন উৎপন্ন হওয়া স্বাভাবিক। প্রত্যেকেই বলছেন ধর্ম শান্তি স্থাপন করে, সুখলাভ করায় এবং প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা নিয়ম-কানুন প্রস্তুত করে বলছেন যে ইহা ধর্ম তথাপিও অশান্তির অবসান হয়না বরং অশান্তিপূর্ণ অবস্থা প্রকাশমান হতেই থাকে। অনেকত্র দেখা যায় কুকুরকে তার প্রভু বাঘের ইংরেজি শব্দ টাইগার নামে সম্বোধন করে, বলে থাকে যে ইহাই তাহার নাম রাখা হয়েছে, কিন্তু তাই বলে কি কুকুর বাঘ হয়ে গেল! কদাপি নয়। তেমনই যা ধর্ম নয় কিন্তু ধর্ম নাম দিলেই তা ধর্ম হয়ে যায়না। ধর্ম শব্দটি মূলত সংস্কৃত শব্দ যা সনাতনীদের শাস্ত্রভাষা। শাস্ত্রানুযায়ী 'ধর্ম' শব্দ কেবল এক সীমিত অর্থে প্রয়োগ হয়না।'ধর্ম' শব্দের বিবিধ এবং ব্যাপক অর্থ। ধর্ম শব্দের সব থেকে ব্যাপক অর্থ, ব্যাকরণগত মূল ধাতু 'ধৃ' এর উপর আশ্রিত। 'ধৃ' অর্থ ধারণ করা। 'ধৃ' ধাতু দ্বারা নির্মিত হওয়ায় ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণকারী। গুণ ও লক্ষণ ধারণ করা ধর্মের অভিপ্রায়। মহাভারতে ঋষি ব্যাসদেব বলিয়াছেন -
ধারণাদ্ ধর্মমিত্যাহুধর্মেণ বিধৃতা প্রজাঃ।
যঃ স্বাদ্ ধারণসংযুক্তঃ স ধর্ম ইতি নিশ্চয়ঃ।। (মহা০-শান্তিপর্ব-১০৯/১১)
অর্থাৎ ধর্ম সব-কিছুকেই ধারণ করে এইজন্য ধর্মের নাম "ধর্ম", অধগতি প্রাপ্তি থেকে বাঁচায় এবং জীবন রক্ষা করে। ধর্মই সকল প্রজাকে ধারণ করে আছে; অতঃ যা দ্বারা ধারণ ও পোষণ সিদ্ধ হয়, তাহাই ধর্ম ; এইরূপ ধর্মবেত্তাদের নিশ্চয়।
যে বচন বা রীতি-রেওয়াজ দ্বারা মনুষ্যের মধ্যে ভেদভাব উৎপন্ন হয়, সামাজিক বিশৃঙ্খলা হয় তাহা ধর্ম নামে প্রচলিত হলেও তা ধর্ম বলিয়া মান্য করা ভুল। মহর্ষি কণাদ প্রণীত বৈশেষিক দর্শনে ধর্মের পরিভাষা করা হয়েছে যে- যতোহভ্যুদয়নিঃশ্রেয়সসিদ্ধিঃ স ধর্মঃ।। (বৈশেষিক দর্শন– ১/১/২)
সূত্রার্থঃ- (যতঃ) যা দ্বারা (অভ্যুদয়) এই সংসারের [বিশ্বের] উন্নতি এবং (নিঃশ্রেয়স) মোক্ষ (সিদ্ধিঃ) সিদ্ধি হয় (স ধর্মঃ) তাকে ধর্ম বলা হয়।
অর্থাৎ যা দ্বারা বিশ্বের উন্নতির সহির শান্তি এবং উত্তম আনন্দ প্রাপ্তি হয় তাহাই ধর্ম। কেহ যদি মনুষ্য শরীর প্রাপ্ত হয়েও পশুত্ব ধারণপূর্বক হিংসা, বিদ্বেষ আদি করে তাহলে সে নিজ ধর্ম হইতে বিচ্যুত হইলো এবং নরকে ধাবিত হইলো। চাণক্যনীতিতে বলা হয়েছে- অত্যন্তকোপঃ কটুকা চ বাণী দরিদ্রতা চ স্বজনেষু বৈরম্।
নীচপ্রসঙ্গঃ কুলহীনসেবা চিহ্নানি দেহে নরকস্থিতানাম্॥ ৭/১৭
নরকবাসীর শরীরে - ১.অত্যন্ত ক্রোধীস্বভাব, ২.কটুভাষণ, ৩.দরিদ্রতা, ৪.স্বজনদের প্রতি দ্বেষভাব, ৫.নীচ ব্যক্তিদের সাথে সঙ্গতি, এবং ৬.কুলহীনের সেবা করার চিহ্ন থাকে।
তাই বেদে উপদেশ করা হয়েছে - "মনুর্ভবঃ" অর্থাৎ মানুষ হও। (ঋগ্বেদ-১০/৫৩/৬)। মনুষ্য দেহ প্রাপ্ত হইলেই মনুষ্য হইয়া যায় না। যার জন্য শাস্ত্রে মনুষ্যদেহধারীকেও মনুষ্যত্বহীন হলে "প্রত্যক্ষো দ্বিপদঃ পশুঃ" (চাণক্য-৩/৭) বলা হইয়াছে। তাহলে মানুষ কাকে বলে? স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী ইহার পরিভাষা করেছেন - "যিনি মননশীল হইয়া সকলের সুখ দুঃখ ও লাভালাভ নিজের ন্যায় মনে করেন, এবং যিনি শক্তিশালী অন্যায়কারীকে ভয় করেন না, কিন্তু দুর্বল ধর্মাত্মা হইতেও ভীত হন, তাঁহাকেই মনুষ্য বলে"। (স্বমন্তব্যামন্তব্য প্রকাশঃ)
অতঃ বুঝা গেল যে ধর্ম বিবিধ হয়না। কেহ এক ধর্ম ত্যাগ করে অন্য ধর্ম গ্রহণ করিলো ইহাও সঠিক নহে, অন্য ধর্ম গ্রহণ করিলো না বরং ধর্ম হইতে পতিত হইলো। এরূপ পতিত ব্যক্তিরা পুনঃ নিজ ধর্মে কিরূপে আসিবে অর্থাৎ ধারণ করিবে তা 'শুদ্ধিবিধি' প্রকরণে লিখিত হইয়াছে, তত্র দেখিয়া লইবেন। একজন প্রকৃত মানুষ তথা ধার্মিক হতে হলে কি কি গুণ ধারণ করা আবশ্যক? মহর্ষি মনু দশটি লক্ষণ বলিয়াছেন যা নিম্নরূপ -
ধৃতিঃ ক্ষমা দমোऽস্তেয়ং শৌচমিন্দিয্রনিগ্ৰহঃ।
ধীর্বিদ্যাসত্যমক্রোধো দশকং ধর্ম লক্ষণম্॥
(মনুস্মৃতি-৬/৯২)
১.প্রথম লক্ষণ - (ধৃতিঃ) সর্বদা ধৈর্য্য অবলম্বন করা;
২.দ্বিতীয় লক্ষন - (ক্ষমা) নিন্দা-স্তুতি, মান-অপমান এবং হানি-লাভাদি দুঃখের মধ্যেও সহিষ্ণু থাকা;
৩.তৃতীয় - (দমঃ) মনকে সর্বদা ধর্মে রত এবং অধর্ম হইতে বিরত রাখা অর্থাৎ অধর্ম করিবার ইচ্ছাও মনে উদিত না হওয়া;
৪.চতুর্থ - (অস্তেয়ম্) চৌর্য্যত্যাগ অর্থাৎ অনুমতি ব্যতীত ছল, কপটতা, বিশ্বাসঘাতকতা বা অন্য কোন কাৰ্য্য বা বেদবিরুদ্ধ উপদেশ দ্বারা পরপদার্থ গ্রহণ করাকে চৌর্য বলে এবং চৌর্য্য পরিত্যাগ করাকেই সাহুকারী বলে,
৫.পঞ্চম - (শৌচম) রাগ, দ্বেষ এবং পক্ষপাত পরিত্যাগ করিয়া ভিতরের জল, ও মৃত্তিকা মার্জ্জনাদি দ্বারা বাহিরের পবিত্রতা রক্ষা করা ;
৬.ষষ্ঠ - (ইন্দ্রিয় নিগ্রহঃ) ইন্দ্রিয় সমূহকে অধর্মাচরণ হইতে নিবৃত্ত করিয়া সর্বদা ধর্মপথে পরিচালনা করা;
৭.সপ্তম - (ধীঃ) মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য বুদ্ধিনাশক পদার্থ, কুসংসর্গ, আলস্য এবং প্রমাদ প্রভৃতি পরিত্যাগ করিয়া উৎকৃষ্ট পদার্থ সেবন এবং সৎসঙ্গ ও যোগাভ্যাস দ্বারা বুদ্ধির উন্নতি সাধন ;
৮.অষ্টম – (বিদ্যা) পৃথিবী হইতে পরমেশ্বর পর্যন্ত (যাবতীয় পদার্থের) যথার্থজ্ঞান এবং ঐ পদার্থ সমূহের দ্বারা যথোচিত প্রয়োজনের সিদ্ধি, আত্মায় যেরূপ সেইরূপ মনে, যেরূপ মনে সেইরূপ বাক্যে যেরূপ বাক্যে সেইরূপ কর্মে আচরণ করাকে বিদ্যা বলে, ইহার বিপরীত অবিদ্যা ;
৯.নবম - (সত্যম্) যে পদার্থ যেরূপ তাহাকে সেইরূপ মনে করা, সেইরূপ বলা এবং সেইরূপ করা ;
১০.দশম - (অক্রোধঃ) ক্রোধাদি দোষ পরিত্যাগ করিয়া শান্তি প্রভৃতি গুণগ্রহণ--এই গুলি ধর্মের লক্ষণ। এই দশ লক্ষণ বিশিষ্ট পক্ষপাত রহিত ন্যায়াচরণরূপ ধর্ম সকলের ধারণ করা উচিত্।
অতঃ হিংসা, দ্বেষ আদি অশান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি দূর করতে হলে সত্যাসত্য জানিয়া তা ধারণ করিলে মতানৈক্য দূর হইবে কেননা সত্য অনেক হয়না কিন্তু মিথ্যা কেবল এক হয়না যা ধারণ করিলে মতভেদ এবং দুঃখ বৃদ্ধি হইবে।
🖋️প্রিয়রত্ন বিদ্যার্থী
