পুরাণ-বিমর্শ
দ্বিতীয় খণ্ড প্রারম্ভ
পূর্ব খণ্ডে তথ্য প্রমাণাদি উপস্থাপনপূর্বক বুঝানোর প্রয়াস করেছি যে পুরাণের মধ্যে কেমন স্ববিরোধ রয়েছে, কেন অপ্রামাণিক, কেন মানার অযোগ্য এবং পুরাণ স্বয়ম্ পুরাণ না মানার পক্ষে কি বলেছে তাও কিঞ্চিৎ উপস্থাপন করেছি। বিবিধ বিষয়ক লেখনীতে কিছুমাত্র শ্লোক সংগ্রহ করা হয়েছে যা অবৈদিক কিন্তু বিস্তারিত বৈদিক তথ্য সহ দেওয়া হয়নি। প্রথম খণ্ডে কেবল পুরাণের তথ্যই দেওয়ার প্রয়াস করেছি, তথাপি কোথাও কোথাও বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রের তথ্য দেওয়া হয়েছে। এই দ্বিতীয় খণ্ডে পুরাণের সাথে সাথে বেদ ও বৈদিক শাস্ত্রের তথ্য সহ উপস্থাপন হবে। এই খণ্ডে পৌরাণিক মান্যতা, পৌরাণিক প্রচারক তথা বিদ্বানের বিবিধ প্রচারের লেখনীর বিষয়েও লেখা হবে এবং আর্য সমাজ তথা ঋষি দয়ানন্দজীকে নিয়ে করা পৌরাণিকদের আক্ষেপ বা মিথ্যাচারের খণ্ডনও করা হবে।
📚যুক্তি তর্কের আবশ্যকতা
অনেকে বলতে পারেন যে মহাপুরুষরা যা বলে গেছেন তার খণ্ডন করা কি উচিৎ হবে? সবক্ষেত্রে তো যুক্তি তর্ক চলেনা। ধর্ম হলো আধ্যাত্মিক বিষয়, বিশ্বাসের বিষয়। ধর্মকে বিজ্ঞান দিয়ে যাচাই করা ঠিক নয়।
দেখুন মহাভারতে ঋষি ব্যাধ বলেছেন –
বেদোক্তঃ পরমো ধর্মো ধর্মশাস্ত্রেষু চাপরঃ।
শিষ্টাচারশ্চ শিষ্টানাং ত্রিবিধং ধর্মলক্ষণম্॥
(বনপর্ব-২০৭/৮৩)
অনুবাদঃ- যা বেদে বর্ণিত তাহাই ধর্মের প্রথম (পরম) লক্ষণ, ধর্মশাস্ত্রে যা প্রতিপাদন করা হয়েছে, তা ধর্মের দ্বিতীয় লক্ষণ এবং শিষ্টাচার ধর্মের তৃতীয় লক্ষণ। শিষ্ট পুরুষগন ধর্মের এইপ্রকার তিন লক্ষণ স্বীকার করেছেন।
অপরদিকে ভগবান মনু বলেছেন -
আর্ষং ধর্মোপদেশং চ বেদশাস্ত্রাবিরোধিনা।
যস্তর্কেণানুসন্ধক্তে স ধর্মং বেদ নেতরঃ॥ (মনু০ ১২/১০৬)
অনুবাদঃ যে মনুষ্য ঋষিবিহিত ধর্মোপদেশ অর্থাৎ ধর্মশাস্ত্রকে বেদ শাস্ত্রের অনুকূল তর্কের দ্বারা অনুসন্ধান করে, সেই ধর্মকে জানতে পারে অন্য কেহ নয়।
যেখানে ঋষিপ্রণীত শাস্ত্রকেই তর্ক দ্বারা অনুসন্ধানপূর্বক গ্রহণের প্রেরণা দিয়েছে সেখানে আচার্যদের বলা কথা বা লিখা নিয়ে তার্কিক বিচার করা যাবেনা কেন? অন্যত্র বলা হয়েছে–
"ন বিনা জ্ঞান-বিজ্ঞানে মোক্ষস্যাধিগমো ভবেৎ (মহা০, শান্তি০-৩২৬/২২)" জ্ঞান-বিজ্ঞান ছাড়া মোক্ষ প্রাপ্তি হয় না অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান দ্বারাই মোক্ষপ্রাপ্তি হয়।
মনুস্মৃতিতে বলা হয়েছে–
য়থা য়থা হি পুরুষঃ শাস্ত্রং সমধিগচ্ছতি।
তথা তথা বিজানাতি বিজ্ঞানং চাস্য রোচতে॥
মনুস্মৃতি-৪/২০
মনুষ্য যেমন যেমন শাস্ত্র বিচার করিয়া তাহার যথার্থ ভাব প্রাপ্ত হয়, সে তেমন তেমন অধিকাধিক জানিতে থাকে এবং তাহার বিজ্ঞানেরই প্রতি প্রীতি জন্মিতে থাকে।
গণেশ গীতায় বলা হয়েছে– বিজ্ঞানেন হি বিজ্ঞানং পরং ব্রহ্ম মুনীশ্বরেঃ॥ (গণেশ গীতা - ১/৩৭)
বিজ্ঞান দ্বারা ই ঋষিগন পরব্রহ্মকে জেনেছেন।
ঋষি দয়ানন্দ জী বলেছেন- কর্ম, উপাসনা ও জ্ঞান এই তিন বিষয় দ্বারা যথাবৎ উপযোগ লওয়া অর্থাৎ পদার্থের যথাবৎ জ্ঞান লাভ করিয়া, তদ্বারা নিজ ইষ্ট সিদ্ধি, সাধন ব্যাপারে পরিণত করা এবং পরমেশ্বর হইতে সামান্য তৃণ পর্য্যন্ত সমস্ত পদার্থের সাক্ষাৎ বোধ করিয়া তদ্বারা যথাবৎ উপযোগ লওয়াকেই বিজ্ঞান বলা হয়। (ঋগ্বেদাদিভাষ্য ভূমিকা, বেদবিষয় বিচারঃ)
©️অমৃতস্য পুত্রাঃ
Tags:
পুরাণ বিমর্শ
