শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা-১৮/৬৬
➤ বর্তমানে অনেকের দাবি যে, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা- অষ্টাদশ অধ্যায়ের ৬৬ নং শ্লোকটি প্রক্ষিপ্ত অথবা ত্যাজ্য। কারণ শ্লোকটিতে বলা হয়েছে -
সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ৷
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ৷৷ ---১৮/৬৬
প্রচলিত অনুবাদ : সর্ব প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে কেবল আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করব। তুমি শোক করো না। ---(শ্রীল প্রভুপাদ ভাষ্যম্)
ধর্ম ত্যাগ এবং পাপ থেকে মুক্ত করা বিষয় নিয়েই বিভিন্ন প্রশ্ন জাগে এই শ্লোকটি নিয়ে। যেমন -
☞ শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ম্ বলেছেন -
শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ॥
---গীতা-৩/৩৫
অনুবাদ : উত্তমরূপে আচরিত অন্য ধর্ম থেকে গুণরহিত নিজ ধর্ম অতি উত্তম। নিজ ধর্মে মৃত্যুও কল্যাণদায়ক, কিন্তু পরধর্ম ভয়াবহ।
শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণ; পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাং।
স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্ নাপ্নোতি কিল্বিষং॥
---গীতা-১৮/৪৭
অনুবাদ : উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত অন্যের ধর্ম হতে গুণরহিত নিজ স্বধর্ম শ্রেষ্ঠ ; কারণ স্বভাবনির্দিষ্ট স্বধর্মরূপ কর্ম করলে মানুষের পাপ হয় না।
সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ॥
---গীতা-১৮/৪৮
অনুবাদ : হে কুন্তীপুত্র! দোষযুক্ত হলেও সহজ অর্থাৎ স্বাভাবিক কর্ম ত্যাগ করা উচিত নয়।
অর্জুন ছিল ক্ষত্রিয়, আর ক্ষত্রিয়ের স্বাভাবিক কর্ম তথা ধর্ম দুষ্টদের দণ্ড দেওয়া, "লোকসংরক্ষণে" অর্থাৎ প্রজাদের রক্ষা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, "যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্" অর্থাৎ যুদ্ধ হইয়ে পলায়ন না করা। ---(গীতা-১৮/৪৩, শুক্রনীতি, মনুস্মৃতি...)
স্বকৰ্মণা তমভ্যর্চ্য সিন্ধিং বিন্দতি মানব:॥ ---(গীতা-১৮/৪৬)
অর্থাৎ মনুষ্য নিজ কর্ম দ্বারা পরমাত্মার অর্চনা করে সিদ্ধিলাভ করে।
ধর্ম্যাদ্ধি যুদ্ধাচ্ছ্রেয়োঽন্যৎ ক্ষত্রিয়স্য ন বিদ্যতে ॥
---(গীতা-২/৩১)
অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছু নেই।
অথ চেত্ত্বমিমং ধর্মং সংগ্রামং ন করিষ্যসি।
তত: স্বধর্মং কীর্তিং চ হিতা পাপমবাপ্স্যসি॥ ---(গীতা-২/৩৩)
অর্থাৎ যদি তুমি ধর্মযুদ্ধ না কর, তবে স্বধর্ম ও কীর্তি ত্যাগ করিয়া তুমি পাপযুক্ত হইবে।
তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত। ---(গীতা-২/১৮)
অর্থ: অতএব অর্জুন তুমি যুদ্ধ করো।
☞ শ্রীকৃষ্ণ নিজেই অর্জুনকে অর্জুনের স্বধর্ম সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন এবং স্বধর্ম ত্যাগ করলে পাপ হবে, তাই যেন স্বধর্ম ত্যাগ না করে পালন করেন, তা দ্বারাই উত্তম গতিপ্রাপ্ত হবে বলেছেন। আবার নিজেই ১৮/৬৬ শ্লোকে সকল ধর্ম ত্যাগ করতে বলেছেন। এই শ্লোকটি মানলে শ্রীকৃষ্ণকে স্ববিরোধী মানতে হবে, নয়তো শ্লোকটিই ত্যাজ্য করতে হবে, এরূপ ভাবনা অনেকের মনেই জাগে।
◾ঋষি দয়ানন্দ থাকাকালীন, রামগোপাল নামক এক ব্যক্তিরও এই শ্লোকটি নিয়ে শঙ্কা হয়েছিল। তিনি গীতার অনেক টিকা অধ্যয়ণ করেছিলেন কিন্তু তাতেও তাহার শঙ্কা দূরীভূত হয়নি। তারপর তিনি ঋষি দয়ানন্দজীর নিকট গিয়ে গীতার ১৮/৬৬ শ্লোকের শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তখন ঋষি দয়ানন্দ বলেছিলেন -
"ধর্মান্" শব্দকে এখানে "অধর্মান্" বুঝা উচিত। "শকন্ধ্বাদিষু পররূপং বাচ্যম্" ব্যাকরণের নিয়মানুসারে "সর্ব" শব্দে বকারে যে অকার রয়েছে, তা "অধর্মান" এর অকারে তদ্রুপ হয়ে যায়, অর্থাৎ বকারে যে অকার রয়েছে তা ইহার সহিত যুক্ত হয়ে যায়, এই প্রকার যদ্যপি "অধর্মান্" শব্দ "ধর্মান্" শব্দরূপ গ্রহণ করে নিয়েছে, পরন্তু বাস্তবে "অধর্মান্" ই রয়েছে। এর দ্বারা রামগোপাল বৈশ্যের শঙ্কা সমাধান হয়ে যায় এবং তিনি সন্তুষ্ট হন।
মহর্ষি দয়ানন্দ জীবন চরিত
দেবেন্দ্রনাথ- ১/১৯১, লেখরাম- ১৯৮
◾মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত আর্যমুনি এই শব্দটির অর্থ লিখেছেন - (সর্বধর্মান্) বেদ বিরোধি সকল ধর্ম।
দর্শন শাস্ত্রে বলা হয়েছে - চোদনালক্ষণোহর্থো ধর্মঃ ---(মীমাংশাদর্শন-১/১/২)
অর্থাৎ যে কর্ম বেদ বিহিত তাহাই ধর্ম আর যা বেদ বিরোধী তাহাকে অধর্ম বলা হয়। নিষ্কর্ষ এটাই হয় যে, তিনিও "সর্বধর্মান্" শব্দ দ্বারা সকল অধর্মই বুঝিয়েছেন। তিনি ভাষ্য ব্যাখানেও এই বিষয়ে লিখেছেন।
উপরোক্ত শব্দার্থ অনুযায়ী পূর্ণ শ্লোকের ভাষ্যম্ -
সর্বধর্মান্পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ৷
অহং ত্বাম্ সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ৷৷
পদপাঠ : সর্বধর্মান্ । পরিত্যজ্য । মাম্ । একম্ । শরণম্ । ব্রজ । অহম্ । ত্বাম্ । সর্বপাপেভ্যঃ । মোক্ষয়িষ্যামি । মা । শুচঃ ।।
পদার্থঃ- হে অর্জুন !
সর্বধর্মান্ = বেদ বিরোধি সকল ধর্মকে
অথবা
সর্ব+অধর্মান্ = সকল অধর্মকে
পরিত্যজ্য = পরিত্যাগ করে
মাম্ একম্ শরণম্ ব্রজ= আমার এক বৈদিকধর্মরূপী শরণকে প্রাপ্ত হও, এমন করিলে
অহম্ = আমি
ত্বাম্ = তোমাকে
সর্বপাপেভ্যঃ = সর্ব পাপ হইতে
মোক্ষয়িষ্যামি = মুক্ত করিয়ে দেবো
মা শুচঃ = তুমি শোক করো না।।
সরলার্থ : হে অর্জুন ! বেদ বিরোধি সকল অধর্মকে পরিত্যাগ করে আমার এক বৈদিকধর্মরূপী শরণকে প্রাপ্ত হও, এমন করিলে আমি তোমাকে সর্ব পাপ হইতে মুক্ত করিয়ে দেবো তুমি শোক করো না।
➤ বাকি রইল পাপমুক্ত করার বিষয়ক শঙ্কা। যারা এই বিষয়টি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন অথবা অহঙ্কারবশত বলেন যে পাপমুক্ত করা যায় না, ইহা বেদবিরুদ্ধ কথন। পাপ করলে শাস্তিভোগ করতেই হবে। তাদের জন্য প্রথমে একটি বেদ মন্ত্র উদ্ধৃত করছি -
অগ্নের্মন্বে প্রথমস্য প্রচেতসঃ পাঞ্চজন্যস্য বহুধা যামিন্ধতে।
বিশোবিশঃ প্রবিশিবাংসমীমহে স নো মুঞ্চন্ত্বংহসঃ।।
---(অথর্ব০-৪/২৩/১)
পদার্থঃ- (প্রথমস্য) সব হইতে পূর্বে বর্ত্তমান (প্রচেতসঃ) প্রকৃষ্ট জ্ঞানী (পাঞ্চজন্যস্য) প্রাণী জগতের হিতকারী (অগ্নেঃ) অগ্নিকে [পরমাত্মাকে] (মন্বে) আমি মনন করি (যম্) যাঁহাকে (বহুধা) বেদ মন্ত্র বহু প্রকারে (ইন্ধতে) প্রকাশ করে (বিশঃ) প্রজায় (বিশঃ) প্রজায় অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুতেই (প্রবিশিবাংসম্) প্রবিষ্টকারী সেই অগ্নিকে [পরমাত্মাকে] (ঈমহে) আমরা প্রাপ্ত হই অর্থাৎ তাঁহার উপাসনা করি (সঃ) তিনি (নঃ) আমাদের (অংহসঃ) পাপ হইতে (মুঞ্চতু) মুক্ত করবেন।
অনুবাদঃ- সব হইতে পূর্বে বর্তমান, প্রকৃষ্ট জ্ঞানী, প্রাণী জগতের হিতকারী পরমাত্মাকে আমি মনন করি। যাঁহাকে বেদ মন্ত্র বহু প্রকারে প্রকাশ করে, প্রজায় প্রজায় অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুতেই প্রবিষ্টকারী সেই পরমাত্মাকে আমরা প্রাপ্ত হই অর্থাৎ তাঁহার উপাসনা করি তিনি আমাদের পাপ হইতে মুক্ত করবেন।
☞ মন্ত্রে পাপ হইতে মুক্ত করার কথন করা হয়েছে, অতএব গীতার শ্লোকটিতে বেদবিরুদ্ধতা হয়নি বরং ইহা বেদানুকূল। আর পাপের শাস্তিভোগ দ্বারা কি পাপমুক্ত হয়না?
◾একটি অনুষ্ঠানে অঞ্জলি আর্য জী বলেছিলেন যে, পাপমুক্ত করার সাধন কেবল আর্য সমাজেই আছে, সাধনটা কি জানতে চান?
শ্রোতাগণ- হ্যাঁ বললেন।
তখন তিনি বললেন পাপমুক্ত থাকার, করার সাধন হলো পাপ না করা, না করতে দেওয়া।
আশা করছি শ্লোকটি নিয়ে শঙ্কার সমাধান পেয়েছেন এবং ভ্রান্তিনিবারণ হয়েছে।
✍️প্রিয়রত্ন বিদ্যার্থী
©️অমৃতস্য পুত্রাঃ
