রামায়ণোক্ত সামাজিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক জীবন
বাণিজ্য-ব্যবসা:
দেশের সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাণিজ্য ও ব্যবসার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। রাজকোষে প্রধান অবদান বণিক ও ব্যবসায়ীদের থেকেই আসে। রামায়ণের সামগ্রিক চিত্র একটি সমৃদ্ধ দেশের প্রতিচ্ছবি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় যে সেই যুগে বাণিজ্য ও ব্যবসাও যথেষ্ট উন্নত অবস্থায় ছিল।
অযোধ্যায় ব্যবসায়ীদের জন্য পৃথক পৃথক বাজার ছিল— "সুবিভক্তান্তরাপণাম্" (১.৫.১০)। সেখানে বিভিন্ন দোকানে প্রচুর রত্ন এবং বিক্রয়ের উপযোগী অন্যান্য দ্রব্য মজুত থাকত— "প্রভূতরত্নং বহুপণ্যসঞ্চয়ম্"(২.১৭.৪৭)। সাজানো বাজার ও দোকানগুলোর সৌন্দর্য ছিল দেখার মতো— "সমৃদ্ধবিপণাপণাম" (২.১৪.২৭)।
চন্দন, অগুরু, উৎকৃষ্ট সুগন্ধি দ্রব্য, ক্ষৌম ও রেশমী বস্ত্র, নিখুঁত মুক্তা এবং উৎকৃষ্ট স্ফটিক রত্ন দ্বারা অযোধ্যার রাজপথের দোকানগুলোর শোভা দ্বিগুণ হয়ে উঠত (২.১৭.৩-৫)।
রামের বনে গমনের সময় শোকে কাতর দশরথ সুমন্ত্রকে আদেশ দিয়েছিলেন যে—
অযোধ্যার মহাধনী বণিকরাও যেন রামের সঙ্গে যান—
"বণিজশ্চ মহাধনাঃ শোভয়ন্তু কুমারস্য বাহিনীঃ" (২.৩৬.৩)।
রাম বনবাসে চলে যাওয়ার পর বণিকদের দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেলে অযোধ্যা এমন নির্জীব ও শ্রীহীন দেখাতে লাগল, যেন নক্ষত্রহীন আকাশ (২.৪৮.৩৫)। চিত্রকূট থেকে ফিরে ভরত এমন এক নিরানন্দ অযোধ্যা দেখলেন, যেখানে সব বণিক সংঘ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছে এবং বাজার ও দোকান খুবই কম খোলা ছিল—
"সম্মূঢ়নিগমাং সর্বাং সংক্ষিপ্তবিপণাপণাম্"(২.১১৪.১৩)।
রামায়ণের যুগে বাণিজ্য ও ব্যবসার উন্নতি তখনকার সুন্দর ও নিরাপদ পথঘাট থেকেও বোঝা যায়। অযোধ্যার সুসংগঠিত পথগুলোর (২.৮৬.১৬) কথা আগেই বলা হয়েছে। লঙ্কার পথগুলোও ছিল প্রশস্ত ও দৃষ্টিনন্দন, যেগুলোতে জল ছিটিয়ে এবং ফুল ছড়িয়ে সাজানো হতো (৬.২৭.৮)। শহরের বাইরেও দূর-দূরান্ত পর্যন্ত রথ চলার উপযোগী রাস্তা নির্মাণ করা হতো। রাম যখন বনে গিয়েছিলেন, তখন তিনি অযোধ্যা থেকে গঙ্গা পর্যন্ত রথে চলার উপযোগী পথেই গিয়েছিলেন (২.৪৬.২৬)।
বর্ষাকালে এই পথগুলো বৃষ্টির জলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে রথ ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলের অযোগ্য হয়ে যেত—
"অভীক্ষ্ণবর্ষোদকবিক্ষতেষু যানানি মার্গেষু ন সম্পতন্তি"(৪.২৮.১৬)।
সুন্দর পথ চলাচল সহজ করে এবং বাণিজ্যের জন্য ভালো রাস্তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ভরত যখন চিত্রকূটে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন, তখন তিনি প্রথমে কারিগরদের পাঠান, যাতে অসমতল ভূমি সমান করে পথ তৈরি করা যায়—
"ক্রিয়তাং শিল্পিভিঃ পন্থাঃ সমানি বিষমাণি চ" (২.৭৬.১৩)।
ব্যবসায়ীরা দূর-দূরান্তে বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে পণ্যসামগ্রী বিক্রি করতেন। বন, পর্বত ইত্যাদি অতিক্রম করে দীর্ঘ পথগুলোতে ব্যবসায়ীদের দলবদ্ধ কাফেলা চলত (৩.৬০.৩৪; ৪.৬৭.৪৮)। সঙ্গী থেকে বিচ্ছিন্ন হলে একজন মানুষের অবস্থা নিরাপত্তাহীনতার কারণে করুণ হয়ে উঠত এবং সে হিংস্র পশু ইত্যাদির বিপদের মুখেও পড়তে পারত।
রামায়ণের যুগে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য যথেষ্ট উন্নত ছিল, তবে সেই সময়ে ভারতের বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের শক্ত প্রমাণ সরাসরি পাওয়া যায় না। তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অযোধ্যা নগরীর বর্ণনায় বাল্মীকি লিখেছেন যে বিভিন্ন দেশের বাসিন্দা ব্যবসায়ীরা সেই নগরীর শোভা বৃদ্ধি করতেন—
"নানাদেশনিবাসৈশ্চ বণিকগ্ভিরুপশোভিতাম্"(১.৫.১৪)।
উত্তর, পশ্চিম, দক্ষিণ প্রভৃতি অঞ্চল থেকে এবং সমুদ্র পার হয়ে বণিকরা অযোধ্যার রাজাকে নানা রকম রত্ন উপহার দিতেন—
"উদীচ্যাশ্চ প্রতীচ্যাশ্চ দাক্ষিণাত্যাশ্চ কেবলাঃ। কোট্যাপরান্তাঃ সামুদ্রাঃ রত্নান্যুপহরন্তু তে।।" (২.৮২.৮)
লবণাসুরকে বধ করার পর শত্রুঘ্ন মধুপুরীকে পুনরায় গড়ে তুলতে শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেই নগরী বিশাল বাড়িঘর, চৌরাস্তা, বাজার এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আগত ব্যবসায়ীদের দ্বারা শোভিত হয়ে ওঠে (৭.৭০.১১, ১৪)।
বাল্মীকি হনুমানের সমুদ্র লঙ্ঘনের প্রসঙ্গে সমুদ্রের বিশালতা, অতিক্রম করা কঠিন হওয়া, বিভিন্ন জীবজন্তু ইত্যাদির যে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন (৫.১), তা থেকে সেই যুগে সমুদ্র সম্পর্কিত জ্ঞানের একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। সমুদ্রে পালযুক্ত নৌকারও প্রচলন ছিল (৫.১.৬৭)।
সমুদ্রে যাত্রার সময় যদি কোনো বণিকের নৌকা অতিরিক্ত মালপত্রে ভরে যেত, তবে বাতাসের ঝাপটায় তা ডুবে যেত—"সমুদ্রমধ্যে নৌঃ পূর্ণা বায়ুবেগৈরিবাহতা"(সুন্দরকাণ্ড ২৫.১৪) “সমুদ্রের মধ্যে পূর্ণ নৌকা বায়ুর বেগে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ডুবে যায়।”
অশোকবাটিকায় হনুমান শোকে ভারাক্রান্ত সীতাকে এমনভাবে দেখেছিলেন, যেমন অতিরিক্ত বোঝায় ভরা নৌকা জলে ডুবে বা নুয়ে পড়ে— “শোকভারৈরিব ন্যস্তাং ভারৈর্নাবভিবাগ্ভসি" (সুন্দরকাণ্ড ১৭/৩)
বাল্মীকি বহু স্থানে অসহনীয় শোক বোঝাতে সমুদ্রের উপমা ব্যবহার করেছেন (অযোধ্যাকাণ্ড ৫৯/২৮....৩২; অরণ্যকাণ্ড ২১/১২) এছাড়া যুদ্ধকাণ্ডে রাক্ষসরা রাবণের প্রশংসা করতে গিয়ে যমলোকের জন্য মহাসাগরের উপমা দিয়েছে এবং দেবসেনা ও মহাসাগরের পারস্পরিক তুলনাও করেছে (যুদ্ধকাণ্ড ৩/১৩-১৪; ২০...২২)। এইসব বিভিন্ন প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায় যে রামায়ণের যুগে বৈদেশিক বাণিজ্যের অস্তিত্ব ছিল।
সেই সময়ের বাণিজ্যে মুদ্রারও প্রচলন ছিল এবং বিনিময় প্রথাও চালু ছিল। রূপা ও সোনার মুদ্রা ব্যবহৃত হতো, যেগুলোকে ‘নিষ্ক’ বলা হতো।(১)। বিনিময় বাণিজ্যে রত্ন, বস্ত্র, স্বর্ণ, পশু, গরু ইত্যাদি ব্যবহার করা যেত, তবে নিষ্ক্রয় রূপে গরুকে সবচেয়ে মূল্যবান বলে গণ্য করা হতো।(২)। যাহার উদাহরণ ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।
রামায়ণ যুগে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যান্য উপায়ের মতো বাণিজ্যও যথেষ্ট রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেত। যখনই কোনো উৎসব বা বৃহৎ যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হতো, তখন রাজ্যের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে ব্যবসায়ীদের হাট-বাজার বসানোর জন্য পাঠানো হতো ( উত্তরকাণ্ড ৯১/১৯-২২)। এসব অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কারিগরদেরও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্মান ও পুরস্কার দেওয়া হতো। (বালকাণ্ড ১৬.৬-১০)
রাম ভরতকে বলেছিলেন— এই পৃথিবী কৃষি ও বাণিজ্যের উপর নির্ভর করে সমৃদ্ধ হয়, তাই এগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা রাজার কর্তব্য -
বার্তায়াং সংশ্রিতস্তাত লোকোঽয়ং সুখমেধতে। তেষাং গুপ্তিপরীহারৈঃ কচ্চিৎ তে ভরণং কৃতম্। রক্ষ্যা হি রাজ্ঞা ধর্মেণ সর্বে বিষয়বাসিনঃ।। (অযোধ্যাকাণ্ড ১০০/৪৭-৪৮)
রাজার সুশাসন ও নিরাপত্তার কারণে ব্যবসায়ীরা নিশ্চিন্তে তাদের পণ্য সামগ্রী
........……………………
১. বালকাণ্ড (১৪/৫১); অযোধ্যাকাণ্ড (৩২/১০); অযোধ্যাকাণ্ড (৭০/২১); উত্তরকাণ্ড (৯৪/১৭-১৮)
২. বালকাণ্ড (৬১/১৩); বালকাণ্ড (৪৯-৫০); বালকাণ্ড (৫৩/৯) প্রভৃতি সঙ্গে দূর-দূরান্তে ভ্রমণ করতে পারত। যে দেশে কোনো রাজা থাকে না, সেখানে অরাজকতার কারণে ব্যবসায়ীরা অনেক পণ্য নিয়ে দীর্ঘ ভ্রমণে যেতে পারে না।
নারাজকে জনপদে বণিজো দূরগামিনঃ। গচ্ছন্তি ক্ষেমমধ্বানং বহুপণ্যসমাচিতাঃ।। অযোধ্যাকাণ্ড (৬৭/২২)
কৃষি, পশুপালন এবং ব্যবসা-বাণিজ্য—এই তিনটি যেকোনো রাষ্ট্রের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। এর সঙ্গে বন থেকে পাওয়া সম্পদ এবং খনি থেকে পাওয়া খনিজ সম্পদ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং বাণিজ্যকে বৈচিত্র্যময় ও উন্নত করে।
রামায়ণ যুগে বনজ সম্পদের মধ্যে উল্লেখ পাওয়া যায়—চন্দন, সাধারণ কাঠ, মধু, গাম (গাছের রস), ফল-ফুল, মসলা, সৌন্দর্যচর্চার উপকরণ, বাকলবস্ত্র (গাছের ছাল থেকে তৈরি পোশাক) ইত্যাদি।(১)। এছাড়া খনিজ সম্পদের মধ্যে ছিল—লোহা, ইস্পাত, ব্রোঞ্জ, রূপা, সোনা, তামা, টিন, রত্ন, প্রবাল, স্ফটিক ইত্যাদি।(২)
এগুলোর পাশাপাশি সেই সময় আরও অনেক ধরনের শিল্প ও পেশা প্রচলিত ছিল। রামের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় ভরত-এর সঙ্গে অযোধ্যার প্রায় সব নাগরিকই গিয়েছিল। সেই বর্ণনায় তখনকার বিভিন্ন শিল্প ও পেশার একটি বিশাল তালিকা পাওয়া যায়।
যেমন—মণিকার (রত্নশিল্পী), কুম্ভকার (মাটির পাত্র নির্মাতা), সূত্রকার (জুলাহা/তাঁতি), অস্ত্রনির্মাতা, ময়ূরক (ময়ূরের পালক দিয়ে ছাতা বা পাখা তৈরি করে), কাঠচেরা কর্মী, মুক্তা গাঁথনেওয়ালা, কাঁচশিল্পী, হাতির দাঁতের কারিগর, রংমিস্ত্রি, সুগন্ধি প্রস্তুতকারক, স্বর্ণকার, কম্বল প্রস্তুতকারক, স্নান করানোর কর্মী, চিকিৎসক, ধূপ প্রস্তুতকারক, মদ বিক্রেতা, ধোপা, দর্জি, গোশালার প্রধান রক্ষক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, জেলে ইত্যাদি—এরা সবাই গরুর গাড়িতে চড়ে ভরতের সঙ্গে গিয়েছিল।( অযোধ্যাকাণ্ড ৮৩/১০-১৬)
এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে রামায়ণের যুগে ভারত ছিল সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যশালী। সেই সময় দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা যথেষ্ট উন্নত ছিল, ফলে মানুষের সাধারণ জীবনযাত্রার মানও উন্নত ছিল।
খাদ্য, পোশাক, অলংকার, বাড়িঘর, উদ্যান, বাজার—সবকিছুতেই এই সমৃদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়।
মানুষের জীবনের চারটি প্রধান লক্ষ্য (পুরুষার্থ)-এর মধ্যে ‘অর্থ’ (সম্পদ) একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। ঋষি বাল্মীকি তাঁর যুগে এই অর্থের গুরুত্ব লক্ষ্মণের মুখ দিয়ে সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন।(৩)। যেমন পাহাড় থেকে নদী প্রবাহিত হয়, তেমনই সঞ্চিত ও বৃদ্ধি পাওয়া সম্পদ থেকেই সমস্ত কাজ সম্পন্ন হয় -
অর্থেভ্যোঽথ প্রবৃদ্ধেভ্যঃ সংবৃত্তেভ্যস্ততস্ততঃ। ক্রিয়াঃ সর্বাঃ প্রবর্তন্তে পর্বতেভ্য ইবাপগাঃ।। যুদ্ধকাণ্ড (৮৩/৩২)
..…………
১. অরণ্যকাণ্ড (৫৫/২১); অযোধ্যাকাণ্ড (৮/৩০)(৭২/২২); সুন্দরকাণ্ড (২/৯-১১); সুন্দরকাণ্ড (১৪/৩-৪); উত্তরকাণ্ড (১/১৫); উত্তরকাণ্ড (৪২/১-৯) প্রভৃতি
২. বালকাণ্ড (১৪/৫৪), (৬৩/২০); অযোধ্যাকাণ্ড (৩২/১৪), (৪০/২৩); (৯৪/৫-৬); (১০০/৪৭); অরণ্যকাণ্ড (২৮/২০)
৩. বাল্মিকী রামায়ণ যুদ্ধকাণ্ড (৮৩/৩১-৪০)
লেখক - পণ্ডিত বলদেব উপাধ্যায় জী
অনুবাদক - বাঁধন চক্রবর্তী