বেদে শচীপতি ইন্দ্র বলতে কি বোঝানো হয়েছে?
আমার নিজস্ব মতামত - পবিত্র বেদে ইন্দ্র শব্দের অর্থে নিরুক্ত, অষ্টাধ্যায়ী, বৃহদ্দেবতা ও ব্রাহ্মণগ্রন্থে - সূর্য, বজ্র, জীবাত্মা, পরমাত্মা ইত্যাদি গ্রহণ করা হয়েছে। তাই এস্থলে ইন্দ্র শব্দের দ্বারা পৌরাণিক কোনো চরিত্রকে কল্পনা করা অহেতুক। পবিত্র বেদ স্বয়ং বলছে -
"ইন্দ্রং মিত্রং বরুণ মগ্নি মাহু ,রথো দিব্যঃ স সুপর্ণো গরুত্মান।
একং সদ্বিপ্রা বহুদা বদন্ত্যগ্নি য়মং মাতরিশ্বানমাহুঃ"॥
(ঋগবেদ ১/১৬৪/৪৬)
অর্থ-এক সত্তা পরব্রহ্মকে জ্ঞানীরা ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অগ্নি, দিব্য, সুপর্ণ, গরুত্মান, যম, মাতরিশ্বা আদি বহু নামে অভিহিত করেন।।
"তদেবাগ্নিস্তদাদিত্য স্তদ্বায়ু স্তদু চন্দ্রমাঃ।
তদেব শুক্রং তদব্রহ্মতা আপঃ স প্রজাপতিঃ"।।
(যজুর্বেদ ৩২।১)
অর্থ- সেই পরমাত্মাই অগ্নি, আদিত্য, বায়ু, চন্দ্রমা, শুক্র, ব্রহ্ম, আপ ও প্রজাপতি।
এবার আসি মূল লেখকের লেখাতে - ডা. হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তার " হিন্দুদের দেবদেবী উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ" গ্রন্থের ২১৯-২২২ পৃষ্ঠা পর্যন্ত শচীপতি ইন্দ্র বলতে বেদে যা বোঝানো হয়েছে এবং সায়ণাচার্য, মহীধর, রমেশচন্দ্র দত্ত ও দূর্গাদাস লাহিড়ী প্রভৃতি পৌরাণিক পণ্ডিতগণ শচীপতি ইন্দ্র কথাটির যা অর্থ করেছেন সেসব তুলে ধরেছেন। তার লেখাটি এখানে দেওয়া হলো -
ঋগ্বেদে ইন্দ্রকে বলা হয়েছে শচীপতি "ইন্দ্রং কুৎসো বৃত্রহনং শচীপতিং কাটে।" ঋগ্বেদ (১/১০৬/৬)
অথর্ববেদেও ইন্দ্র শচীপতি:-
শিক্ষেয়মস্মৈ দিৎসেয়ং শচীপতে মনীষিণে॥ অথর্ববেদ (২০/২৭/২)
শৃণাতু গ্রীবাঃ শৃণাতূষ্ণিহা বৃত্রস্যেব শচীপতিঃ।। অথর্ববেদ (৬/১৩৪/১)
স্কন্ধানমূষ্য শাতয়ন্ বৃত্র্যস্যেব শচীপতিঃ।'' অথর্ববেদ (১/১৩৫/১)
কৃষ্ণযজুর্বেদেও শচীপতি ইন্দ্রের উল্লেখ:
শচীপতিত্ত্ব বভেন যজ্ঞং দাখার।। কৃষ্ণযজুর্বেদ - ৪/৩/৪/৮
শচী শব্দের অর্থ কি? সায়ন লিখেছেন, "শচীতি কর্মনাম।” শচীপতি শব্দের অর্থ: "সর্বেষাং কর্মনাং পালয়িতায়ম্।'[ ঋগ্বেদ ১/১০৬/৬ - সায়ণভাষ্য ] অর্থাৎ শচী শব্দের অর্থ কর্ম। শচীপতি অর্থে সকল কর্মের পালয়িতা।
কর্ম অর্থে শচী শব্দের প্রয়োগ বৈদিক গ্রন্থাবলীতে স্থানে স্থানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে; শুক্ল যজুর্বেদের একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে: "সুরাং ব্যপিবঃ শচীভিঃ সরস্বতী ত্বা মঘবন্নভিষ্ণক্।"[ যজুর্বেদ ১০/৩৪ ] - হে ইন্দ্র! তুমি শচীগণের দ্বারা সুরাপান করেছিলে; হে মঘবন্, সরস্বতী তোমার সেবা করেছিলেন।
এখানে শচী অর্থে ইন্দ্র-পত্নী হওয়া সম্ভব নয়। আচার্য মহীধর বলেছেন, শচীভিঃ কর্মভিঃ নমুচিবধাদিং কৃত্বেত্যর্থঃ।" অর্থাৎ নমুচি বধ প্রভৃতি কর্মের দ্বারা অথর্ববেদের একটি মন্ত্রে আছে:-
'যশোদং প্রদিশি যদ্বিরোচতে প্রো চা ণতি বিচষ্টে শচীভিঃ।' অথর্ববেদ (৭/২৫/২)
-যে বিষ্ণুর প্রদেশে (ইচ্ছায়) এই বিশ্ব প্রকাশ পাচ্ছে, শচীগণের দ্বারা (কর্মের দ্বারা) প্রাণ প্রকাশিত হচ্ছে।
এখানেও শচী শব্দ কর্মবাচক। মহীধর লিখেছেন, "শচীভিঃ কর্মভিঃ বিচষ্টে।" - কর্মের দ্বারা চেষ্টিত হয়েছিলেন।
ঋগ্বেদের একটি মন্ত্র থেকেও শচী শদের তাৎপর্য সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দ্যু মাঁ অসি ক্রতুমা ইন্দ্র ধীরঃ শিক্ষা শচীবস্তব নঃ শচীভিঃ ॥" ঋগ্বেদ (১/৬২/১২)
-হে শচীব অর্থাৎ সৎকর্মস্বরূপ, আপনার কর্মের দ্বারা আপনি আমাদিগকে সদ্ বস্তু দান করুন। - অনুবাদঃ দূর্গাদাস লাহিড়ী
ইন্দ্র এখানে শচীবান্। শচীপতি না বলে শচীবান্ বলা হয়েছে। শচীবান্ ও শচীপতি সমার্থক হলেও শচীবান্ অর্থে শচীর স্বামী বোঝায় না। শচীবান্ শচীদের দ্বারা আমাদের সদ্বস্তু (অথবা কর্ম বা যজ্ঞ) প্রদান করবেন বললে শচী শব্দে কর্ম বা কর্মশক্তি না বললে অর্থ হয় না।
শচীশব্দ সুতরাং কর্মকেই ব্যঞ্জিত করছে। অদ্ভুতকর্মা ইন্দ্র বৃত্র, নমুচি, শম্বর, বল প্রভৃতি বহু দানব বধ করেছেন; সূর্যকে প্রকাশ করেছেন, বৃষ্টিদান করে জীবের জীবন রক্ষা করছেন। অতএব ইন্দ্র মহত্তর কর্মের পতি-শচীপতি।
ঋগ্বেদের একটি ঋকে অশ্বিদ্বয় শচীপতিরূপে সম্বোধিত হয়েছেন - "নঃ শক্তং শচীপতি শচীভিঃ"। ঋগ্বেদ (৭/৬৭/৫) - হে শচীপতিদ্বয়, স্তোত্রপ্রযুক্ত আমাদিগকে (ধন) প্রদান কর।- অনুবাদেঃ রমেশচন্দ্র দত্ত
অনুবাদে রমেশচন্দ্র শচী শব্দের স্তোত্র অর্থ গ্রহণ করেছেন। শচীপতি অশ্বিদ্বয় স্তোত্রের অধিপতি হতে পারেন। কিন্তু শচীদের দ্বারা বা স্তোত্রের দ্বারা ধন দান কিঞ্চিৎ বিসদৃশ বোধ হয়। ঋগ্বেদে অন্যত্র মিত্র ও বরুণকেও শচীপতি বলা হয়েছে। রমেশচন্দ্রের মতে এখানে শচীশব্দ যজ্ঞকে বোঝাচ্ছে। শচীপতি শব্দের অর্থ যজ্ঞের পালনকর্তা। " ঋগ্বেদে শচী অর্থ যজ্ঞ, শচীপতি অর্থে যজ্ঞপতি। ইন্দ্রকেই অনেকস্থানে শচীপতি অর্থাৎ যজ্ঞপতি বলা হয়েছে। এই ঋকে মিত্র ও বরুণকে শচীপতি বলা হইয়াছে। পৌরাণিকাকলে লোকে শচীপতি শব্দের অর্থ ভুলিয়া গেল এবং ইন্দ্রকে শচীপতি বলিয়া ইন্দ্রের স্ত্রীর নাম শচী বিবেচনা করিল। এইরূপে পৌরাণিক গল্প সৃষ্ট হইয়াছে। - ঋগ্বেদের বঙ্গানুবাদ (১/৮২/৫) - ঋকের টীকা - রমেশচন্দ্র দত্ত
কারো কারো মতে শচী শব্দের বল - শক্তি। দানববধ প্রভৃতি কার্য্যের দ্বারা ইন্দ্র অত্যাশ্চর্য শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। সুতরাং ইন্দ্র বলাধিপতি শচীপতি। কৃষ্ণযজুর্বেদে বলা হয়েছে - "হন্তাসুরাণামভবচ্ছচীভিঃ"। কৃষ্ণযজুর্বেদ (৪/৪/৩/২) - তুমি শচী অর্থাৎ শক্তির দ্বারা অসুরগণের হন্তা হয়েছিলেন।
এখানে মহীধরের ভাষ্যে শচী শব্দের অর্থ শক্তি। ঐতরেয় আরণ্যকে আছে, " ইন্দ্র নদীব এদিহি প্রসূতিরা শচীভিঃ।" - হে ইন্দ্র, তুমি শক্তির দ্বারা নদীর মতো এই যজ্ঞভূমিতে আগমন কর।
আচার্য সায়ণ এখানে শচী অর্থে কর্মশক্তি গ্রহণ করেছেন - "শচীভিঃ শক্তিভিঃ"।"
ডাঃ ক্ষিতীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন - " As regards Sachi there is a great difference of opinion among scholars, most of whom think that Sachipati which in R. V. means lord of strength, gradually came to mean 'husband of Sachi' by popular etymology and gave rise to the idea that Sachi is the wife of Indra." - Vedic Selections, Vol -2, C.U
ইন্দ্রের কর্ম ও কর্মশক্তি একই কথা। সুতরাং ইন্দ্রের কর্ম বা কর্মশক্তি সংক্ষেপে শক্তি শচী। পৌরাণিক দেবপত্নীগণও দেব-শক্তি। এই হিসাবে ইন্দ্রের শক্তি শচী ইন্দ্রপত্নী ইন্দ্রাণীতেও পরিণত হওয়া সম্ভব।
ইন্দ্রের স্বরূপ আলোচনায় আমরা দেখেছু, ইন্দ্র সূর্যাগ্নি। সূর্যরূপী ইন্দ্র যজ্ঞের অধিপতি। শচী শব্দকে যজ্ঞ অর্থে গ্রহণ করলেও কোন বিরোধ হয় না। যজ্ঞের শক্তি শচী এরূপ অর্থও গ্রহণ করা যেতে পারে। স্তোত্র যজ্ঞের অঙ্গ। সুতরাং শচী স্তোত্ররূপা।
আমার নিজস্ব মতামত -
ইন্দ্রের বৃত্র, নমুচি বধ প্রভৃতি হলো আখ্যান। এগুলো বিবিধ প্রাকৃতিক ঘটনাকে নির্দেশ করে। যেমন ইন্দ্র, বৃত্রের আখ্যানকে নিরুক্তে বজ্রপাত ও মেঘের মধ্যাকার সংঘটিত ঘটনাকে বলা হয়েছে। নিরুক্ত (২/১/১৬/১০) - অমরেশ্বর ঠাকুরের নিরুক্ত ভাষ্য।
তাছাড়া নিঘণ্টু (২/১) তে "শচী ইতি কর্মনাম" বলা হয়েছে।
নমস্কার
ধন্যবাদ

